হার না মানা হেলেনা    

দুপুরের রোদ তখন বরিশাল-ভোলা সড়কের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোকে আরও লাল করে তুলেছে। রাস্তার দুধারে সারি সারি গাছ। তার ফাঁক গলে আসছে হিমশীতল বাতাস। সেই পথ দিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। চালকের আসনে এক নারী। হাত তুলে দাঁড় করাতেই প্রথমে তাকালেন খানিক সংশয়ে। পরে রিকশা থামালেন। নাম বললেন হেলেনা। মলিন পোশাক, রুগ্ন শরীর। চোখের নিচে ক্লান্তির দাগ। কিন্তু হ্যান্ডেলে ধরা হাত দুটি শক্ত। যেন ছেড়ে দিলে জীবনটাই থেমে যাবে। বরিশালে নারী রিকশাচালক নতুন, তাই হেলেনাকে আলাদা করে চোখে পড়ে। কারণ তার মুখে কোনো নাটকীয়তা নেই। অভিযোগও কম। শুধু বেঁচে থাকার একরোখা চেষ্টা আছে।

তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন মেয়ের মা হেলেনা। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এখন ছোট মেয়েকে নিয়েই তার সংসার। বয়স কম, কিন্তু চিন্তা অনেক। কারণ তৃতীয় মেয়ের জন্মের পরই স্বামী চলে গেছেন। কোথায় গেছেন, এখন আর সে হিসাবও রাখেন না হেলেনা। শুধু জানেন, ফিরে আসেননি। তারপর থেকে জীবন মানেই কাজ। কখনো মানুষের বাড়িতে, কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি, কখনো দিনমজুরি সব করেছেন। শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছেন রিকশার হ্যান্ডেলে। রিকশাটিও তার নিজের নয়, ভাড়ায় আনা। প্রতিদিন ৩০০ টাকা জমা দিতে হয় মালিককে।  সারাদিন রাস্তায় কাটিয়ে আয় হয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। সব হিসাব মিটিয়ে হাতে থাকে কখনো ২০০, কখনো ৩০০। কোনো কোনো দিন সেটুকুও না। তবু রাস্তায় নামতেই হয়। কারণ থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া খেয়াঘাটের পাশে একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন হেলেনা। টিনের ঘরটির ভাড়া তিন হাজার টাকা। মাসের শেষে সেই টাকাও জোগাড় করতে পারেন না সবসময়। তখন শুনতে হয় বাড়িওয়ালার কথা। হেলেনার বাবার বাড়ি পটুয়াখালীতে। স্বামীর বাড়ি বরিশালের রূপাতলী এলাকায়। স্বামীর সূত্রেই এই শহরে আসা। তারপর একদিন মানুষটিই চলে গেলেন।

তবে রিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। নারী বলেই প্রথম দিকে কেউ তাকে রিকশা দিতে চাননি। অনেকে সন্দেহ করেছেন। কেউ বলেছেন, গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন। ‘আমি সবাইরে কইছি, ভাই আমি চোর না। খাইয়া-পইরা বাঁচতে চাই’ বলছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অনেক অনুরোধের পরে এক মালিক একটি পুরনো রিকশা দেন তাকে। নতুন চালক বলে ভালো রিকশাও মেলেনি। তবে সমস্যার শেষ সেখানেই নয়। রাস্তায় পুরুষ রিকশাচালকদের কটূক্তিও শুনতে হয় মাঝেমধ্যে। কেউ হাসাহাসি করেন, কেউ তির্যক মন্তব্য ছুড়ে দেন। হেলেনা অবশ্য এখন আর খুব একটা উত্তর দেন না। তিনি জানেন, সন্ধ্যার আগে তাকে জমার টাকা তুলতেই হবে।