প্রায় ২০০ বছরের পুরনো জেলা শহর পাবনার কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষের চিকিৎসার মূল ভরসা ২৫০ শয্যার পাবনা জেনারেল হাসপাতাল। লোকবল, যন্ত্রপাতি ও ওষুধের সংকটে হাসপাতালটির অধিকাংশ সেবাই সীমিত। জেলার মা ও শিশু হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোরও একই অবস্থা। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে নানা সরকারি উদ্যোগের দাবি করা হলেও পাবনার হাসপাতালগুলোর ও চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। এখনো ন্যূনতম চিকিৎসার জন্য জেলার মানুষকে লড়াই করতে হয়।
২০১৬ সালে জাঁকজমকে উদ্বোধন করা হয়েছিল পাবনা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল ও যন্ত্রাংশের অভাবে ৯ বছর পেরিয়েও সেটি চালু হয়নি। হাসপাতালের ২০ শয্যার সিসিইউ ইউনিটেও পর্যাপ্ত মনিটর ও সরঞ্জাম না থাকায় পূর্ণ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। জেনারেটর অকেজো থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে অস্ত্রোপচার বন্ধ হয়ে যায়।
হাসপাতালে আধুনিক সিটিস্ক্যান ও এক্সরে মেশিন থাকলেও ফিল্মের সংকটে বছরের বেশিরভাগ সময় পরীক্ষা বন্ধ থাকে। প্যাথলজি বিভাগেও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, রোগীদের অধিকাংশ পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হয়। বিনামূল্যের ওষুধও নিয়মিত পাওয়া যায় না।
সদর উপজেলার দোগাছি গ্রামের আব্দুস সালাম চিকিৎসা নিতে এসে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাব ভেবেছিলাম। কিন্তু পরীক্ষা হাসপাতালের বাইরে করাতে হচ্ছে, ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।’
চাটমোহর থেকে আসা রোগীর স্বজন মামুন হোসেনের অভিযোগ, ‘গুরুতর রোগীদের ঢাকায় বা রাজশাহীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রোগীর ঝুঁকিও বাড়ে।’
জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পাবনা জেনারেল হাসপাতাল কাগজ-কলমে ২৫০ শয্যার হলেও এখানে জনবল কাঠামোর তেমন পরিবর্তন হয়নি। ডাক্তার, নার্সসহ সব পদেই জনবলের অভাব। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে অধিকাংশ সময়ই হাজারের বেশি রোগী থাকে। রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেলে বরাদ্দ সংকটে সেগুলো প্রতিস্থাপন করা যাচ্ছে না।’
পাবনা মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রেরও করুণ অবস্থা। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতাল চলছে মাত্র একজন অস্থায়ী চিকিৎসক ও কয়েকজন অস্থায়ী কর্মচারী দিয়ে। সপ্তাহে দুদিন বহির্বিভাগ চালু থাকলেও নার্স ও আয়ার অভাবে রোগীরা কাক্সিক্ষত সেবা পায় না। দীর্ঘদিন চিকিৎসক সংকটে বন্ধ ছিল সিজারিয়ান অপারেশনও। মাসে ৫০ থেকে ৬০টি নরমাল ডেলিভারি হলেও নবজাতকের জন্য নেই কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ।
স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক হোসেন বাবর বলেন, ‘একজন ডাক্তার দিয়ে এত বড় হাসপাতাল চলে না। ডাক্তার না থাকায় রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে যায়।’
সংকটে রয়েছে জেলার একমাত্র বক্ষব্যাধি হাসপাতালও। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটিতে বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক রয়েছেন। ল্যাব টেকনিশিয়ানের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ এক্সরে, ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম। কফ পরীক্ষা ছাড়া অন্য কোনো পরীক্ষা হয় না। চিকিৎসকের জন্য রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র জেলার চরাঞ্চলে। পদ্মা ও যমুনা বেষ্টিত দুর্গম চরগুলোতে প্রায় দুই লাখ মানুষের বাস। কার্যকরী কমিউনিটি ক্লিনিক না থাকায় সেখানে নেই জরুরি চিকিৎসাসেবা। শুষ্ক মৌসুমে বালুচর পেরিয়ে আর বর্ষায় নৌকায় করে রোগীদের হাসপাতালে নিতে হয়।
চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও জনবল ও অর্থবলের অভাবে তা চালু হয়নি। সামান্য অসুস্থতাও অনেক সময় বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পাবনার স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। তারা বলেন, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, দক্ষ জনবল ও আধুনিক অবকাঠামো ছাড়া জেলার স্বাস্থ্য খাতের দুর্গত দশা কাটানো সম্ভব নয়।
পাবনার সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘জনবল সংকট সারা দেশেই প্রকট। পাবনার বিভিন্ন হাসপাতালের সংকটের কথা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত তার সমাধান হবে। পাবনায় ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণাধীন রয়েছে। মেডিকেল কলেজ চালু হলে জেলার স্বাস্থ্যসেবার সংকট অনেকটাই লাঘব হবে।’
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর মতে, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যবিষয়ক কাজের পরিধি বাড়ছে। জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ের কথা ভাবছে সরকার। চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা নিশ্চিতের উদ্যোগও নেওয়া হবে।’