মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. আবদুল্লাহ ইবনে আওয়াদ আল জুহানি মহান আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিয়ে বলেন, মুসলিম উম্মাহর সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। এই ইবাদত কবুলের মূল চাবিকাঠি হলো হালাল উপার্জন, একনিষ্ঠ নিয়ত এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ। প্রতি বছর আল্লাহর প্রিয় বান্দারা হজে যেতে ব্যাকুল হয়ে থাকেন। হজে মাবরুর বা কবুল হজের মহিমা অপরিসীম, যার চূড়ান্ত প্রতিদান জান্নাত, এর মাধ্যমে মানুষ নবজাতকের মতো নিষ্পাপ হওয়ার সুযোগ পায়।
শায়খ বলেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়! আমি আপনাদের মহান আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে তাকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। কারণ আপনারা তারই কুদরতের অধীনে এবং তারই ইচ্ছার অনুগত। তার থেকে পালানোর কোনো জায়গা নেই, বরং তার কাছেই আশ্রয় নিতে হবে। আপনাদের কথা-কাজে আল্লাহর সঙ্গে সত্যবাদী হোন এবং আল্লাহর কিতাব ও তার রাসুলের সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন। কারণ এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সুখ, সম্মান ও মুক্তি। জেনে রাখুন, মহান আল্লাহ আপনাদের অন্তরের গোপন খবরও জানেন যেমন তিনি আপনাদের প্রকাশ্য বিষয়গুলো জানেন। তার কাছে আপনাদের কোনো কিছুই গোপন নয়।
হজযাত্রীদের উচিত, পবিত্র মক্কা ও মদিনায় বিশেষ আদব বজায় রাখা এবং অহেতুক কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকা। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞ আলেমদের সঠিক দিকনির্দেশনা হাজিদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। ওহি নাজিলের এই পবিত্র ভূমিতে রবের কাছে তওবার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করাই হজের মূল উদ্দেশ্য।
শায়খ বলেন, মহান আল্লাহ সামর্থ্যবানদের ওপর হজ ফরজ করেছেন। তিনি এই ইবাদতের বিনিময়ে বিপুল সওয়াব ও নেয়ামত নির্ধারণ করেছেন। তিনি ওয়াদা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘরে হজ করবে এবং অশালীন কথা ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকবে, সে তার গুনাহসমূহ থেকে সেদিনের মতো পবিত্র হয়ে বের হবে যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল। আর এটাই হলো হজে মাবরুর, যার প্রতিদান আল্লাহ জান্নাত ছাড়া আর কিছু নির্ধারণ করেননি।
হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহ হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তিনি এই উম্মতকে সত্যের দিশা দিয়েছেন, হেদায়েতের পথ দেখিয়েছেন এবং কল্যাণের পথ ও সুখের উপকরণসমূহ সহজ করে দিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য আশা ও ভরসার দুয়ার উন্মুক্ত রেখেছেন। ফলে একটি নেক কাজের মৌসুম শেষ হতে না হতেই আরেকটি মৌসুমের আগমন ঘটে।
এই পবিত্র দিনগুলোতে মহান আল্লাহর ঘরে যেতে হজযাত্রীদের মনে প্রচণ্ড ব্যাকুলতা ও আবেগ তৈরি হয়, যাতে তারা হজ, ওমরাহ এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদে জিয়ারত করতে পারেন। আমি আল্লাহর কাছে তাদের হজের সফরের সহজতা, অবস্থানে স্বস্তি এবং সবার জন্য হজে মাবরুর তথা কবুল হজের তওফিক কামনা করছি।
মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত হলো, তিনি হজকে জীবনে মাত্র একবার ফরজ করেছেন সেই মুসলিমের ওপর, যে সামর্থ্য রাখে। যে ব্যক্তি হজের সংকল্প করবেন, তার উচিত কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের উদ্দেশ্য ও নিয়তকে শুদ্ধ করা এবং নিজের প্রতিটি কাজ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ মোতাবেক সম্পন্ন করা। হজের খরচ হিসেবে হালাল উপার্জন বেছে নেওয়া উচিত, কারণ মহান আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কিছু কবুল করেন না। এটিই সওয়াব বৃদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমার ক্লান্তি ও ব্যয়ের পরিমাণ অনুযায়ী তোমার সওয়াব নির্ধারিত হবে। (দারাকুতনি)
হে হাজি সাহেবরা! আমি আপনাদের বিশেষভাবে নসিহত করছি, আপনার প্রতিটি কাজ মহান আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে করবেন এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে নিজের অন্তরকে সম্পৃক্ত করবেন না। আপনার কোনো প্রয়োজন কেবল আল্লাহর কাছেই চাইবেন। কারণ তিনি প্রয়োজন পূরণকারী, দোয়া কবুলকারী এবং সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। সবাই তার মুখাপেক্ষী। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘(বলো তো) কে তিনি, যিনি নিরুপায় ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাকে ডাকে, তার বিপদ দূর করেন এবং তোমাদের জমিনের প্রতিনিধি বানান? আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো ইলাহ আছে? তোমরা খুব সামান্যই শিক্ষা গ্রহণ করো।’ (সুরা নামল ৬২)
মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো বিপদে ফেলেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমার জন্য কোনো কল্যাণ চান, তবে তার অনুগ্রহ ফিরিয়ে দেওয়ারও কেউ নেই। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার অনুগ্রহ দান করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ইউনুস ১০৭)
হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহকে ভয় করুন, আল্লাহর নির্দেশাবলিকে সম্মান করুন এবং তার ঘর ও তার রাসুলের শহরে আদব ও শিষ্টাচার বজায় রাখুন। হজের বিশুদ্ধতা বজায় রাখা, আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করা, সুন্দর আচরণ, মিষ্টভাষা ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে সওয়াব অর্জনে সচেষ্ট হোন।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে সত্য ইমান, কবুলযোগ্য নেক আমল, খাঁটি তওবা, হজে মাবরুর, গুনাহের ক্ষমা, দোষত্রুটির গোপন রাখা, অন্তরের হেদায়েত এবং আপনার পক্ষ থেকে রহমত ও সন্তুষ্টি কামনা করছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের, আমাদের বাবা-মাকে এবং সকল মুসলিমকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.), তার পরিবার ও অনুসারীদের ওপর রহমত ও বরকত নাজিল করুন।
হে আল্লাহর ঘরের মেহমানরা, আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং জেনে রাখুন, হজ ও ওমরাহর কিছু রুকন, ওয়াজিব, সুন্নত ও আদব রয়েছে। যখন একজন মুসলিম ইহরাম বাঁধেন, তখন তিনি নিজেকে এমন কিছু কাজের জন্য দায়বদ্ধ করেন যা অবশ্যই পূর্ণ করতে হয় এবং ইহরামের নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিহার করা আবশ্যক হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজের নিয়মকানুন শিখে নাও। (আবু দাউদ)।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র স্থানসমূহে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়েছেন, যারা হারামাইন শরিফাইনের সেবা এবং পবিত্র স্থাপনা ও আগত মেহমানদের সুরক্ষা করতে সক্ষম। সৌদি সরকার হারামাইন শরিফাইন এবং প্রতিটি মিকাতে আলেমদের নিয়োগ দিয়েছে, যারা মানুষকে হজের নিয়মকানুন শেখাবেন এবং সঠিক পথের দিশা দেবেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো, যদি তোমরা না জানো।’ (সুরা নাহল ৪৩)
এর পাশাপাশি হাজিদের সেবায় ডিজিটাল ব্যবস্থা রয়েছে। সুতরাং হে হাজি ভাই ও বোনেরা! আপনারা হজ ও ওমরাহকে কবুল করার বিষয়ে যতœশীল হোন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মাবরুর হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। (তাবারানি) তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশালীন কথা ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল, সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এলো। (সহিহ বুখারি)
হে হজযাত্রীরা! ওহি নাজিল হওয়ার এই পবিত্র স্থানে আপনাদের জন্য এটি এক সুবর্ণ সুযোগ। এখানে আপনারা গুনাহের কালিমা ধুয়ে ফেলার জন্য চোখ থেকে অনুশোচনার পানি ফেলুন, রবের কাছে ক্ষমা চান এবং খাঁটি তওবা করুন, যা আল্লাহ কবুল করবেন।
হে আল্লাহর বান্দারা! সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করুন। হে আল্লাহ! আপনি খোলাফায়ে রাশেদিন, সব সাহাবি ও অনুসারীদের ওপর সন্তুষ্ট হোন। হে আল্লাহ! আপনি হাজি ও ওমরাহ পালনকারীদের রক্ষা করুন এবং তাদের জন্য ইবাদত সহজ ও নিরাপদ করুন। আপনি আমাদের ও সব মুসলিমের ওপর থেকে বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যাধি, কষ্ট ও ফিতনা দূর করে দিন, যা আপনি ছাড়া কেউ দূর করতে পারে না।
হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদের শক্তিশালী করুন এবং আপনার অনুগ্রহে সত্যের পতাকাকে সমুন্নত করুন। হে আল্লাহ, বিশ্বের সব মুসলিম শাসককে আপনার কিতাব ও রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী চলার তওফিক দিন এবং তাদের ওপর আপনার রহমত বর্ষণ করুন।
হে আল্লাহ! আপনি সব মুসলিম দেশের হেফাজত করুন। আমরা আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে অসন্তুষ্টি থেকে এবং আপনার ক্ষমার মাধ্যমে শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। আমরা আপনার প্রশংসা গণনা করে শেষ করতে পারব না। হে আল্লাহ! আমাদের পাপের কারণে আমাদের শাস্তি দেবেন না এবং আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তাদের কাজের জন্য আমাদের পাকড়াও করবেন না। হে আল্লাহ! আপনি ইসলাম ও মুসলিমদের সব জায়গায় সাহায্য করুন। আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল। আপনি আমাদের ওপর রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করুন।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আপনার সৃষ্টি, আমাদের গুনাহের কারণে আপনার অনুগ্রহ থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না। হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আমাদের তওবা কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু।
৮ মে শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খ্তুবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন
মুফতি আতিকুর রহমান