সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-বিষয়ক প্রচারের জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) এ-ব্লকের দেয়ালে একটি এলইডি ডিসপ্লে বসানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ডিসপ্লে স্থাপন করেন। সাড়ে ৩৮ লাখ টাকা মূল্যের ডিসপ্লেটি মাত্র ১৮ মাস সচল ছিল। শুধু ডিসপ্লে স্থাপন নয়, প্রয়োজন ছাড়াই এমন অনেক কিছুই কেনা হয়েছে ভিসি শারফুদ্দিন আহমেদের আমলে। এসব কেনাকাটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ লুটপাটের জন্যই করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি, চাকরি স্থায়ীকরণের শতকোটি টাকার ঘুষ গ্রহণসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ একটি আদেশ জারি করেন। তাতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকা- ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনসমূহের বিষয়ে প্রচারের জন্য প্রতিষ্ঠানটির এ-ব্লকের ছাদে উন্নতমানের পি-৬ ফুল কালার এসএমডি আউটডোর এলইডি ডিসপ্লে বসাতে হবে। ১৭৩.২৫ (১০.৫ী১৬.৫) স্কয়ার ফুটের টিভি স্থাপনের ব্যয় ধরা হয় ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে ডিসপ্লে স্থাপনের বিল পরিশোধ করা হবে। এরপর ৩১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. স্বপন কুমার তপাদার এলইডি ডিসপ্লে স্থাপনের আদেশ জারি করেন। আদেশে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে কেন্দ্রীয় ক্রয় কমিটির মাধ্যমে পিপিআর-২০০৮ অনুসরণ করে বিধি মোতাবেক ডিসপ্লে কেনার অনুমতি দেওয়া হলো।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এসএম ইয়ার ই মাহবুব ও মিডিয়া সেলের সমন্বয়ক সুব্রত বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন কমিটি ডিসপ্লে স্থাপনের কাজ করেন। ভিসির ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরশ প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্সের মালিক এসএম এরশাদ আলী ওই ডিসপ্লে বসানোর কাজ করেন।
বিএমইউর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিসপ্লে বসানোর বিষয়ে তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আগ্রহ ছিল না। ভিসি নিজের প্রভাব খাটিয়ে এটি স্থাপন করেন। ডিসপ্লেতে কী কী প্রচার করা হতো তা নির্ধারণ করত বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া সেল। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এটির মাধ্যমে প্রচারের কাজ শুরু হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে ডিসপ্লে বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এটি চালানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন রুম থেকে
এবং কে পরিচালনা করত তার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এটি আর ব্যবহৃত হয়নি। দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করায় এটি অকেজো হয়ে যাওয়ার কথা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ গতকাল বুধবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এ-ব্লকে ডিসপ্লে বসানোর বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি বিষয়টির খোঁজ নেবেন। ডিসপ্লে স্থাপনে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।’
জানা গেছে, বাজারে বিভিন্ন দামের ডিসপ্লে রয়েছে। পি৬ কালারের সাধারণ ডিসপ্লের দাম প্রতি বর্গফুট দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। মাঝারি মানের ডিসপ্লের দাম প্রতি বর্গফুট ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। আর উন্নতমানের ডিসপ্লের দাম প্রতি বর্গফুট ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা। মাঝারি বা উন্নত মানের ডিসপ্লে কিনতে খরচ হবে ৭ লাখ থেকে ১৪ লাখ টাকা। সঙ্গে স্থাপনখরচ আরও লাখখানেক টাকা । সবমিলিয়ে ডিসপ্লের খরচ ৮ থেকে ১৫ লাখ টাকা । কিন্তু সেটির দাম সাড়ে ৩৮ লাখ টাকা ধরায় এটি স্থাপনে বিএমইউর অর্থ বিভাগ আপত্তি জানায়। কিন্তু আপত্তি না মেনেই ভিসি ও তার কমিটি ডিসপ্লে স্থাপন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ডা. ইয়ার-ই-মাহবুবের কমিটি বাজারমূল্য থেকে বেশি দাম দেখিয়ে ডিসপ্লে স্থাপন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের মালামাল কেনার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা আত্মসাৎ করেছে। কমিটি বিএমইউর কনভোকেশনের সময় ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা নয়ছয় করেছেন। এ ছাড়া টেন্ডারে কোনো ধরনের পিপিআর অনুসরণ না করেই পছন্দের বক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বিএমইউর ভিসি হওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার এসএম এরশাদ আলীর টুইন এন্টারপ্রাইজ ও পরশ প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনাকাটা করতে শুরু করেন। কেনাকাটা নির্বিঘœœ করতে তার আস্থাভাজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এসএম ইয়ার-ই- মাহবুব ও মিডিয়া সেলের সমন্বয়ক সুব্রত বিশ্বাসের সমন্বয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে দেন। এ কমিটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টিং-সামগ্রী, গিফট আইটেম, ফাইল কভার, সাইনবোর্ড, ডিসপ্লে বোর্ড, বেডশিট, বালিশ, চাদর, অ্যাপ্রোন, এরোসল, রুম স্প্রে, মাস্ক, সিজার, কাগজ, কলম, কম্পিউটার, প্রিন্টার ও টোনারসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী কেনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন না থাকলেও একাধিকবার ডায়েরি ছাপানো হয়েছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালেন্ডার ছাপানোসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
সাবেক ভিসি শারফুদ্দিন আহমেদের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী প্রশাসন ঠিকাদার এসএম এরশাদ আলীর টুইন এন্টারপ্রাইজ ও পরশ প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স কয়েক কোটি টাকার বিল আটকে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ অর্থ বছরের ২ কোটি ৩১ লাখ ৫১ হাজার ২৬২ টাকার বিলও রয়েছে।