অ্যালগরিদমের মারপ্যাঁচে গুজবের ভয়াবহতা

ভোরের আলো ফোটার আগেই, আঙুলের ডগায় হাজির হয় পৃথিবীর খবর। যে স্মার্টফোন হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানের আধার, সেটিই হয়েছে মারণঘাতী অস্ত্রের নাম। সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে খবর যার বেশির ভাগের সত্যতা নেই। আমরা এমন এক ডিজিটাল গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছি, যেখানে সত্যের চেয়ে মিথ্যার গতি অনেক বেশি। গুজবের বিষাক্ত ছোবলে কখনো জ্বলছে কারও বসতভিটা, কখনো ভেঙে চুরমার হচ্ছে সাজানো জীবন। সামাজিক মাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘গুজব সংস্কৃতি’ আমাদের মানবিকতা, বিবেক এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমরা এমন এক ‘তথ্য বোমার’ ওপর দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে তথ্যের চেয়ে আতঙ্কের চাষ বেশি হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে অপতথ্য ও ভুল তথ্যের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল ওই এক বছরেই ৪,০০০-এর বেশি স্বতন্ত্র গুজব শনাক্ত করেছেন ফ্যাক্ট-চেকাররা। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ‘ডিপফেক’ কনটেন্ট। গত বছর একটি ধর্মীয় উৎসবের সময়, ফেসবুকে সামান্য ফটোশপ করা ছবি ছড়িয়ে একটি জেলাকে দাঙ্গার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ডিজিটাল কার্ড বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা অসম্ভব। ডিজিটাল সন্ত্রাস কেবল ব্যক্তিকে নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমের কারিগরি মারপ্যাঁচে, গুজব আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর পছন্দ ও আবেগের ওপর ভিত্তি করে কনটেন্ট পরিবেশন করে। ফলে একজন ব্যক্তি যখন কোনো নির্দিষ্ট ঘরানার সংবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন, অ্যালগরিদম তাকে সেই জাতীয় আরও বেশি ভুয়া তথ্য দেখাতে শুরু করে। একে বলা হয়, ‘ইকো চেম্বার’ ইফেক্ট। এর ফলে মানুষ নিজের বিশ্বাসের বাইরে অন্য কোনো সত্য গ্রহণ করতে চায় না। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি করা এমন কিছু সংবাদের লিঙ্ক বুস্ট করা হয়েছে, যা কেবল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের ওয়ালে পৌঁছেছে। এতে সমাজের ভেতরে একটি অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়। ফলে মানুষ চরমপন্থি মনোভাবের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই ডিজিটাল দেয়াল ভাঙতে না পারলে, গুজব প্রতিরোধ করা অসম্ভব। গুজব ছড়ানোর পেছনে একটি বড় কারণ হলো, ‘আউটসোর্সিং প্রোপাগান্ডা’। বর্তমানে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ছোট ছোট ‘আইটি সেল’ ভাড়া করেন। এই সেলগুলোর কাজ হলো, ২৪ ঘণ্টা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো কিংবা কোনো মিথ্যা এজেন্ডাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তারা শত শত ফেক আইডি ব্যবহার করে একই কমেন্ট বা পোস্ট বারবার করতে থাকে, যাতে সাধারণ মানুষের মনে হয় এটাই জনমত। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের অন্তত ১০টি এমন গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যারা কেবল ইউটিউব থাম্বনেল এবং ভুয়া ভয়েসওভার দিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছে। এই নোংরা বাণিজ্যের শিকার হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, যারা না বুঝে এই চক্রের হয়ে কাজ করছে। শুধু রাজনীতি নয়, গুজব এখন দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারকেও অস্থির করে তুলছে। গত বছরের অক্টোবর মাসে ‘ব্যাংকে টাকা নেই’ এমন একটি ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার পর, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিতে শুরু করেন, যা ব্যাংকিং সেক্টরে একটি কৃত্রিম তারল্য সংকট তৈরি করে। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট বা রিজার্ভে তখন যথেষ্ট টাকা ছিল। এই একটি গুজবের কারণে দেশের অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। একইভাবে ডলারের দাম বা নিত্যপণ্যের মজুদ নিয়ে গুজব ছড়িয়ে, সিন্ডিকেটগুলো বাজার অস্থির করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যখন তথ্য সঠিক সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছায় না, তখনই গুজব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেয়।

গুজবের অবাধ বিচরণ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা সময়ের দাবি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ কি শুধু রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে ব্যস্ত? যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য দিবালোকে একজনের চরিত্র হনন করা হয় কিংবা সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়া হয়, তখন প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ ফ্যাক্ট- চেকিংয়ের নামে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন, যা তথ্যের সত্যতা যাচাইকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রকৃত গুজব রটনাকারী কীভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের। ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্মানের ক্ষেত্রে গুজবের নেতিবাচক প্রভাব আরও করুণ। ‘ডিজিটাল ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’ বা চরিত্র হনন এখন প্রতিপক্ষকে দমনের সহজ উপায়। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের টার্গেট করে কুরুচিপূর্ণ ফটোশপ ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একজন নারী প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ছড়ানো একটি বানোয়াট ভিডিও, তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে ফরেনসিক রিপোর্টে তা ভুয়া প্রমাণিত হলেও সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে যে দীর্ঘমেয়াদি দাগ পড়ে যায়, তার প্রতিকার কী? এই সংকটের গভীরতা তখনই আরও বৃদ্ধি পায়, যখন কিছু সংবাদমাধ্যম অসতর্কতাবশত গুজবের ফাঁদে পা দেয়। সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা যখন ক্ষুন্ন হয়, তখন সাধারণ মানুষ দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং অন্ধভাবে সামাজিক মাধ্যমের অশুভ প্রবাহের দিকে ঝুঁকে যায়। তথ্যের অবাধ প্রবাহের এই যুগে সংবাদকর্মীদের দায়িত্ব কেবল দ্রুত সংবাদ পৌঁছানো নয়, বরং তথ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করে নাগরিকের কাছে দায়বদ্ধ থাকা।

ডিজিটাল সন্ত্রাসের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যারা বিদেশে বসে ভিডিও কলের মাধ্যমে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ-টেলিগ্রাম ব্যবহার করে গুজবের বীজ বপন করছে, তাদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি সীমাবদ্ধতা ও কূটনৈতিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে দিনের পর দিন দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা উসকে দিচ্ছে। দেশের ভেতরেও যারা গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের বড় মহলের ছত্রছায়ায় থাকা কিংবা ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্টের দীর্ঘসূত্রিতা বিচার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে। অপরাধীরা যখন দেখে যে, উসকানিমূলক পোস্ট দিয়েও তারা পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের স্পর্ধা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সংস্কৃতি সমাজকে এক চরম নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের চোরাবালি থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের কেবল আইনের কঠোরতা নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও কাঠামোগত লড়াইয়ে নামতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি বড় ডিজিটাল প্ল্যাটর্মে গুজব শনাক্ত করার জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ‘ন্যাশনাল ফ্যাক্ট-চেকিং সেল’ গঠন করতে হবে, যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে। দ্বিতীয়ত, ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো গ্লোবাল টেক জায়ান্টগুলোর ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উসকানিমূলক কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে নেয় এবং গুজব রটনাকারীদের ডেটা শেয়ার করে। তৃতীয়ত, দেশের প্রতিটি নাগরিককে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের শিষ্টাচার শেখাতে হবে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে অন্তত ১০০ নম্বরের একটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা কোনো খবর দেখলেই তা বিশ্বাস না করে আগে তার উৎস খুঁজতে শেখে। চতুর্থত, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বিশেষ ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করতে হবে এবং ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত করার জন্য উন্নত এআই টুল ব্যবহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ একটি সমন্বিত ‘জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিল’ গঠন করতে পারে। যেমনটা তাইওয়ান বা ইউরোপীয় দেশগুলো করেছে। তারা গুজব শনাক্তের জন্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং হিউম্যান ইনভেস্টিগেশন উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করে। আমাদের দেশেও প্রতিটি সরকারি দপ্তরে একজন করে ‘ডিজিটাল মুখপাত্র’ নিয়োগ দেওয়া জরুরি, যিনি প্রতিদিন অন্তত একবার গণমাধ্যমের সামনে এসে ওই দিনের আলোচিত গুজবগুলোর সত্যতা স্পষ্ট করবেন।

তথ্যের শূন্যতা তৈরি হতে দিলে, গুজব সেই শূন্য জায়গা দখল করে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে রিয়েল-টাইম তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে গুজবের ভয়াবহতা নিয়ে প্রচার চালাতে হবে, কারণ সাধারণ মানুষ তাদের কথার ওপর বেশি আস্থা রাখে। গুজব কেবল একটি ভুল তথ্য নয়, এটি একটি মরণব্যাধি যা সমাজকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়, একটি মিথ্যার পেছনে ঢাকা পড়ে যায় হাজারো সত্য। আর সেই অন্ধকারের সুযোগ নেয় স্বার্থান্বেষী মহল। আমরা যদি আজ রুখে না দাঁড়াই, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই হাতিয়ার একদিন আমাদের সবার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সম্মিলিত প্রতিরোধই পারে এই বিষবাষ্পকে রুখে দিতে। সত্যকে জয়ী করতে হলে, মিথ্যার বিরুদ্ধে নীরবতা ভাঙতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার শেয়ার করা একটি ছোট্ট ভুল তথ্য কারও জীবনের শেষ সম্বল কেড়ে নিতে পারে। এ সময়ে গুজবমুক্ত ডিজিটাল সমাজ গড়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। মিথ্যার জয় সাময়িক হতে পারে, কিন্তু সত্যের শক্তি চিরস্থায়ী এই বিশ্বাসই হোক আগামীর পাথেয়। প্রযুক্তি যেন আমাদের অন্ধত্বের কারণ না হয়, বরং তা যেন হয় সত্যের মশাল। আগামী দিনে একটি সুস্থ, গুজবমুক্ত ও নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণ ভীষণ প্রয়োজন। আজ থেকেই তথ্য প্রদানের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন হয় সুচিন্তিত, তথ্যবহুল ও নীতিনিষ্ঠ। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোতে নয়, উন্নয়ন মানুষের চিন্তা ও তথ্যের শুদ্ধতায়। সম্মিলিত বুদ্ধিবৃত্তিক সচেতনতাই হোক, ডিজিটাল যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ঢাল।

লেখক: সিইও ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

antora00111@gmail.com