অস্বস্তিকর পতন হচ্ছে আমেরিকার?

ইতিহাস খুব কমই, ঢাকঢোল পিটিয়ে কোনো ঘটনা ঘোষণা করে। বেশিরভাগ বড় পরিবর্তন হয় নীরবে। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বেইজিং সফর ছিল, তেমন এক ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র তখন চীনের সঙ্গে এমন সম্পর্ক পুনর্গঠনে এগিয়ে গিয়েছিল, যাকে সে দীর্ঘদিন বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চেয়েছিল। কয়েক বছর পর দেং জিয়াও পিংয়ের আমেরিকা সফর, বিশ্বকে আরেকটি বার্তা দিয়েছিল। চীন  বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে নয়, বরং তার ভেতরে প্রবেশ করে তাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করতে চায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বেইজিং বৈঠক হয়তো সেই ঐতিহাসিক নাটকীয়তার পুনরাবৃত্তি করবে না। গ্রেট হল অব দ্য পিপলের কোনো ছবি সম্ভবত নিক্সন-মাওয়ের ছবির মতো, ইতিহাসের প্রতীকে পরিণত হবে না। তবু এই সম্মেলনকে নিছক আরেকটি কূটনৈতিক রুটিন বলে দেখার সুযোগ নেই। এর গুরুত্ব লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী তিন দশক যুক্তরাষ্ট্র এমন এক আত্মবিশ্বাসে কাটিয়েছে, যেন তার সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। ওয়াশিংটনের বড় অংশ বিশ্বাস করত, অর্থনৈতিক একীভূতের মধ্য দিয়ে চীন ধীরে ধীরে পশ্চিমা রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকবে। চীনকে দেখা হতো বিশাল উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে, সভ্যতাগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। আজ সেই ধারণা শুধু ভুল নয়, অনেকাংশে বোকামি বলেও মনে হয়।

আজকের চীন অতীতের মতো বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল রাষ্ট্র নয়। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি; এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এবং এমন এক প্রযুক্তিগত শক্তি, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে সেমিকন্ডাক্টর পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে আমেরিকার দীর্ঘদিনের একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, চীন এই উত্থান ঘটিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে জড়িয়ে নয় বরং বাণিজ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত ধৈর্যের মাধ্যমে। বেইজিংয়ের দিকে যাত্রা করছে এমন এক আমেরিকা, যার কাঁধে কৌশলগত ক্লান্তির ভার স্পষ্ট। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা সাম্প্রতিক ইরান-সংকট, সব ক্ষেত্রে একটি প্রবণতা চোখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু করতে পারদর্শী, কিন্তু তা রাজনৈতিকভাবে টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে প্রায়ই ব্যর্থ। সামরিক শক্তির প্রাচুর্য সবসময় কৌশলগত সাফল্য নিশ্চিত করে না; বরং অনেক সময় তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। চীন ঠিক সেই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ নিয়েছে। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও বেইজিং সরাসরি সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে গেছে।

ইরান থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে, আঞ্চলিক মধ্যস্থতার পক্ষে থেকেছে এবং নিজেকে যোদ্ধার চেয়ে সম্ভাব্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। এটি আদর্শবাদ নয়; বরং বাস্তববাদ। কারণ হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাস্তববাদকে দুর্বলতা বলা যায় না। প্রায়শই সেটিই পরিপক্বতার পরিচয়। পশ্চিমা বিশ্বে চীনকে প্রায়ই এমন এক আগ্রাসী শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে উল্টে দিতে চায়। দক্ষিণ চীন সাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক বা তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিং নিঃসন্দেহে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। কিন্তু তার পদ্ধতি অধিকাংশ সময়ই সামরিক আঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, অবকাঠামোগত সংযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল। তাইওয়ান ইস্যুতেও চীনের আচরণে একটি হিসাবি সতর্কতা দেখা যায়। শি জিনপিং একাধিকবার পুনরেকত্রীকরণকে ঐতিহাসিক লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু বেইজিং এখনো ইউক্রেনে রাশিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানে যায়নি। কারণ চীনা কৌশলবিদরা বোঝেন বড় শক্তির যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু তার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তি যুদ্ধেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও চিপ নিষেধাজ্ঞা চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারবে। তথাকথিত ‘স্মল ইয়ার্ড, হাই ফেন্স’ নীতির লক্ষ্য ছিল উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও এআই অবকাঠামো থেকে বেইজিংকে বিচ্ছিন্ন রাখা। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো। চীন দেশীয় উদ্ভাবনে গতি বাড়িয়েছে, নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং পশ্চিমা জোটের বাইরে নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত শিথিলতায় যেতে হয়েছে, কারণ বাজার হারানোর চাপ আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল। এখানেই একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতির একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়।  গভীরভাবে আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনকে বিচ্ছিন্ন করা, সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিচ্ছিন্ন করার মতো সহজ নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন নতুন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ই জানে, আগামী দশকের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব অনেকাংশে নির্ধারিত হবে এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও উন্নত অটোমেশনের মাধ্যমে। কিন্তু এখানে একটি বড় বৈপরীত্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই এই প্রতিযোগিতাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বনাম কর্তৃত্ববাদের লড়াই হিসেবে তুলে ধরে। অথচ বিশ্বের বহু দেশ এখন মতাদর্শের চেয়ে সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর সেই সক্ষমতার প্রদর্শনে চীন অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে গেছে। চীনের উত্থান যেমন অনিবার্য নয়, তেমনি তার পতন অবধারিত নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের ধারণা। আর সেখানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে বেইজিংয়ের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সংঘাত, অস্থির শুল্কনীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা এবং হঠাৎ সামরিক সিদ্ধান্ত এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি ইউরোপের অনেক দেশ এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিচ্ছে। তারা আর এককভাবে আমেরিকার ওপর ভরসা করতে পারছে না। চীন এই সুযোগটি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। নিজেকে স্থিতিশীল বাণিজ্য, অবকাঠামোগত সংযোগ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছে  যা অনেক দেশের কাছে আমেরিকার অস্থিরতার বিপরীত প্রতিচ্ছবি। বেইজিং সম্মেলনের প্রকৃত গুরুত্ব তাই কোনো যৌথ বিবৃতির ভাষায় নয়, বরং তার প্রতীকে। বিশ বছর আগে আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা চীনা নেতাদের সঙ্গে কথা বলতেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অবস্থান থেকে। আজ পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। চীনও নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট এক পক্ষ ক্রমশ বেশি প্রতিক্রিয়াশীল দেখাচ্ছে, অন্য পক্ষ ধৈর্যশীল। সম্ভবত ইতিহাস এই বৈঠককে কোনো নাটকীয় সন্ধিক্ষণ হিসেবে নয়, বরং ধীর এক ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের প্রতীক হিসেবেই মনে রাখবে।

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

writemah71@gmail.com