রাজধানীর মিরপুরে হযরত শাহআলীর (র.) মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন বয়সী ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল লাঠিসোঁটা ও পাইপ নিয়ে মাজারে থাকা লোকজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং মারধর করে সবাইকে বের করে দেয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাজারের স্থাপনাও। মাজার জিয়ারতকারী এবং স্থানীয় মানুষ এ হামলার জন্য জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের দায়ী করেছেন। পুলিশও একই অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে হামলায় দলের কারও জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে জামায়াত। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ থানায় মামলা কিংবা লিখিত অভিযোগ করেননি। এদিকে মাজারে হামলার ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সমালোচনার ঝড় বইছে।
মাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে মাজারে একটি সাপ্তাহিক উরস হয়। সেখানে ঢাকা এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে লোকজন আসে। বৃহস্পতিবার রাতে উরস চলাকালে হঠাৎ লাঠিসোঁটা হাতে কিছু লোক এসে জিয়ারতকারীদের মারধর শুরু করে এবং সবাইকে বের করে দেয়। হামলায় মাজারের স্থাপনার কিছু কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজার ও সুফি দরগায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাতের ওই হামলা হয়েছে কিনা তা নিয়ে আতঙ্কিত মাজারের অনুসারীরা।
পিটুনিতে আহত কামাল নামের এক ব্যক্তি বলেন, রাতে উরস চলছিল। সে সময় লাঠিসোঁটা হাতে একদল লোক এসে ‘আল্লাহু আকবর’ সেøাগান দিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। জিয়ারতকারীদের মারধর শুরু করে। হামলাকারীরা মাজারের ভেতর পর্যন্ত গিয়ে লোকজনকে মারধর করেছে। হামলায় তিনি মাথায় আঘাত পেয়েছেন। জামায়াত-শিবিরের লোকজন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আব্দুস সবুর নামের আরেকজন বলেন, কিছু লোক এসে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। অনেক লোক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকেন। সে সময় মোবাইলে ধারণ করা ছবি দেখিয়ে তিনি জানান, ওই লোকজন নেতৃত্ব দিয়েছে। তবে সাদা পোশাকের পুলিশ অভিযান চালিয়েছে কিনাÑ প্রশ্ন করলে আব্দুস সবুর ও উপস্থিত বেশ কয়েকজন সমস্বরে ‘না’ ‘না’ বলে ওঠেন। তবে তাদের একজন বলেন, ওই সময় মাজারের গেটের বাইরে পুলিশের চারটি গাড়ি থাকলেও তারা ভেতরে ঢোকেনি। এরা নিশ্চয়ই একটা পরিকল্পনা করে এসেছে। না হলে পুলিশ কেন ভেতরে ঢুকল না? তাহলে কারা হামলা চালিয়েছেÑ জানতে চাইলে পাশ থেকে একজন বলেন, সব জামায়াতের লোক।
পুলিশের মিরপুর বিভাগের বিভাগের উপকমিশনার মো. মোস্তাক সরকার বলেন, মাজার এলাকায় পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গেলে সেখানে কিছু উৎসুক মানুষ নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে। পরে পুলিশ সেখান থেকে ফিরে আসে। হামলার সময়ের যেসব ভিডিও ফেসবুকে এসেছে, সেখানে অর্ধশতাধিক লোককে লাঠি হাতে মারধর করতে দেখা গেলেও কোনো পুলিশ দেখা যায়নি।
অভিযান চালানোর কথা অস্বীকার করে দারুস সালাম জোনের সহকারী কমিশনার ইমদাদ হোসেন বিপুল বলেন, মাজারে তো আমরা অভিযান চালাইনি। রাতে দেখলাম, জামায়াত-শিবিরের পোলাপান, মনে হয় ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিযান চলেছে। গত সপ্তাহে বিএনপির স্থানীয় নেতা মিরাজ যেমন নিজ উদ্যোগে অভিযান চালিয়েছিলেন। কাল মনে হয় জামায়াত-শিবির নিজ উদ্যোগে অভিযান চালিয়েছে। এতে পুলিশ জড়িত নয়। পুলিশ সেখানে গিয়েছিল কিনাÑ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘না না না, একটা পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে আমরা কীভাবে অভিযান করব! পুলিশ বাইরে ছিল কিনাÑ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘বাইরেও থাকিনি আমরা। আমরা দেখেছি যে একটি ঝামেলা হচ্ছে। যখন আমরা আঁচ করতে পেরেছি, এরকম একটা অভিযান উনারা (জামায়াত-শিবির) করবে, তখন আমরা (বৃহস্পতিবার) কোনো অভিযান করব না বলে সিদ্ধান্ত নিই। তখন আমরা আমাদের মতো ফিরে আসি।
হামলার শিকার লোকজন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের দায়ী করলেও এ আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত ব্যারিস্টার আরমান ঘটনার সঙ্গে তার দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে যা ঘটেছে, সেটা পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের ফল। পুলিশ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, সেখানে প্রতিদিন রাতে গাঁজার আসর বসে, বৃহস্পতিবার রাতে অনেক মাদকসেবীর আড্ডা হয়। এখানে একটা বড় অভিযান চালানো হবে। এতটুকুই আমাকে জানানো হয়েছিল। ব্যাপারটা হচ্ছে একটা ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ রকম অবৈধ অশ্লীল কাজে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। আমার নির্বাচনী ইশতেহারের সবচেয়ে বড় ওয়াদা ছিল মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সেজন্য আমরা পুলিশকে বারবার বলেছি, পুলিশও বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে সবচেয়ে বেশি মাদক বেচা-বিক্রি হয় এবং প্রকাশ্যে হয়, সেজন্য পুলিশ অ্যাকশন নিয়েছে। তাকে কয়েকজনে হামলার ভিডিও পাঠিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভিডিওগুলো আমি দেখেছি। সেখানে আমার পরিচিত বা দলের কোনো লোক আমি দেখিনি।’
হামলার ঘটনার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মাজারের পূর্ব পাশে খালি জায়গায় মাদুর ও পলিথিন বিছিয়ে বসে আছেন ভক্তরা। সেখানে পণ্যের পসরা সাজিয়ে হকাররাও বসেছিলেন। রাত ১টার দিকে লাঠি হাতে ও মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক পরা একদল লোক তাদের ওপর হামলা চালায়। সে সময় ভক্ত ও অনুসারীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি করেন। একপর্যায়ে হামলাকারীরা ভক্ত অনুসারীদের পিটিয়ে বের করে দেয়। তখন কয়েকজন আহত হন। আরও দেখা যায়, হামলাকারীরা কয়েকজন মহিলাকে ঘিরে ধরেন। এর মধ্যে একজনকে জেরা করতে থাকেন। ওই মহিলা বলেন, না, না। আমার কাছে কিছু নেই। আমি মাজারে আসছি। তাকে আঘাত না করতে হামলাকারীদের প্রতি করজোরে অনুরোধ জানানো হয়। ভিডিওতে হামলাকারীদের মারধরে আতঙ্ক সৃষ্টির বিষয়টি ফুটে ওঠে।
শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাইরে থেকে আসা কিছু ছেলেমেয়ে রওজার একেবারে মুখ ঘিরে বসে। যেখানে শুক্রবার নামাজ পড়া হয়। সেখানে বসে কেউ গাঁজা খায় না। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে সেখানেও গাঁজা খাওয়ার আসর বসানো হয়েছিল। সে কারণে জিয়ারতিরাই তাদের সরিয়ে দেয়। এ নিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। মাজারে হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
তিনি বলেন, ‘হামলার শিকার অনেকে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার কথা বলছেন। বিষয়টি তদন্ত করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর আমি ফোর্স নিয়ে গিয়েছিলাম। এতে পুলিশের কোনো ভূমিকা নেই।’
এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ কোনোপ মামলা কিংবা লিখিত অভিযোগ করেননি বলেও জানান তিনি।