৮৬ বছর আগের ‘খেয়াল’

পুরনো পরিত্যক্ত একটি আলমারিতে হঠাৎই খুঁজে পাওয়া গেল ৮৬ বছর আগের লালচে রঙের নিউজপ্রিন্টের বইসদৃশ এক অনন্য দলিলের। এটি কোনো বই নয়, বাঁশের কঞ্চি আর কালো কালির বিন্যাসে স্বপ্নের বুনন, যার ভাঁজে লুকিয়ে আছে সাহিত্যচর্চার অদম্য প্রচেষ্টা। সাহিত্যের প্রতি একদল তরুণের নিখাঁদ ভালোবাসা। 

সময় ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ। স্থান বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁওয়ের প্রাণকেন্দ্র পানাম নগরী। এ নগরীর পূর্ব প্রান্তে ১২৫ বছর আগে ধনাঢ্য হিন্দু ব্যবসায়ী গঙ্গাবাসী পোদ্দার ও রামচন্দ্র পোদ্দার পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর জন্য গড়ে তুলেছিলেন একটি শিক্ষালয়। পরবর্তী সময়ে সোনারগাঁ গঙ্গাবাসী ও রামচন্দ্র পোদ্দার ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি এই শিক্ষালয়ের একদল সাহিত্যপাগল তরুণ আজ থেকে ৮৬ বছর আগে সুপ্ত প্রতিভা প্রকাশে বের করে ‘খেয়াল’ নামে একটি সাময়িকী।

‘খেয়াল’ নামে ১৬৬ পৃষ্ঠার সাহিত্য সাময়িকীটি শুধু তরুণদের খেয়ালি মনের স্ফুরণ নয়, আমাদের সাহিত্যের প্রবহমান ধারার এক জীবন্ত ইতিহাসও। সম্পূর্ণ হাতে লেখা এই সাময়িকীটি তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও সাহিত্য বোধেরও এক অপূর্ব সম্মিলন।

ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ প্রান্তে ১৯৪০ সালে সাহিত্য সাময়িকীটি প্রকাশ করেছিলেন বিদ্যালয়ের তৎকালীন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। প্রকাশের তারিখ লেখা রয়েছে ২৭ আশি^ন, ১৩৪৬ বঙ্গাব্দ। এটি শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় প্রকাশনা। প্রকাশনাটিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, এর আগে ওই শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় সাহিত্য সাময়িকীর প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করে। যদিও ওই প্রথম সংখ্যাটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তবে ভাগ্যক্রমে একটি পরিত্যক্ত আলমারি স্টোর রুম থেকে বের করার সময় ওই প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন অধ্যক্ষ সুলতান মিয়ার নজর পড়ে সাহিত্য সাময়িকীটির ওপর। তিনি এটি উদ্ধার করেন। তবে যথাযথভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় এর কিছু অংশ উইপোকা খেয়ে নষ্ট করেছে। বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠা ছেঁড়া।

সাময়িকীটির প্রথম পৃষ্ঠায় চার লাইনের একটি স্তুতি দিয়ে শুরু করা হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পৃষ্ঠায় রয়েছে লেখার সূচিপত্র। এ ছাড়া নবম পৃষ্ঠায় শিক্ষার্থীরা এ সাময়িকী সম্পর্কে ‘নিবেদন’ শিরোনামে একটি লেখায় সাময়িকীর প্রথম সংখ্যা ও দ্বিতীয় সংখ্যা নিয়ে বিশদ তথ্য দিয়েছেন।

সাময়িকীটি দেখে বোঝা যায়, যারা এটি প্রকাশ করেছিলেন তারা এ সাময়িকীর পেছনে কতটা শ্রম দিয়েছেন। চমৎকার সাময়িকীটিতে যিনি হস্তাক্ষর বিন্যাস করেছেন তা এককথায় অসাধারণ। সাহিত্য সাময়িকীটিতে ৯টি কবিতা, সাতটি গল্প, একটি ভ্রমণ কাহিনী, তিনটি প্রবন্ধ, একটি রসরচনাসহ ২১টি বৈচিত্র্যময় লেখা স্থান পেয়েছে।

সাহিত্যপ্রেমী তরুণদের প্রকাশিত সাময়িকীটিতে লেখার সঙ্গে স্থান পেয়েছে হাতে আঁকা ছয়টি বিভিন্ন বিষয়ের ছবি। সাময়িকীর দশম পৃষ্ঠায় একটি চমৎকার প্রচ্ছদ আঁকা হয়েছে। প্রচ্ছদটি এঁকেছেন ‘মনি ভট্টাচার্য’। তবে তিনি শিক্ষার্থী নাকি শিক্ষক এ তথ্য সাময়িকীটিতে পাওয়া যায়নি।

সাময়িকীতে স্থান পাওয়া কালি দিয়ে স্কেচ করা ছয়টি ছবিই এঁকেছেন ‘কেদার’ নামে এক ব্যক্তি। সাময়িকীটিতে তিনটি করে কবিতা লিখেছেন ভূপেন দে এবং শিব প্রসাদ ভট্টাচার্য নামের দুই শিক্ষার্থী। পাশাপাশি  ভূপেন দে  জুঁইফুল ছদ্মনামে শ্রাবণ মাস ও মোহন বেণু নামে আরও দুটি কবিতা লিখেছেন।

সাময়িকীটিতে স্থান পাওয়া সাতটি গল্পের মধ্যে ‘পরিবর্তন’ নামে একটি বড় গল্প লেখেছেন বিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক হিরন ঘোষ, বিএ। বাকি ছয়টি গল্পের মধ্যে শিবপ্রসাদ ভট্টাচার্য মৌরীফুল ছদ্মনামে লিখেছেন ‘ভাগ্যচক্র’, ‘কথা ও কাহিনী’ শিরোনামে দুটি গল্প। এ ছাড়া ‘মায়া’ শিরোনামে অমল গুহ রায়, ‘হারাধনের সুমতি’ শিরোনামে জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ‘ভ্রাতৃ-মিলন’ শিরোনামে ভূপেন দে ও ‘ক্রসওয়ার্ড’ শিরোনামে সলিল গুহ রায় বাকি গল্পগুলো লিখেছেন। তিনটি প্রবন্ধের মধ্যে অমল গুহ রায় লিখেছেন ‘আগমনী’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ। এ ছাড়া আকাশের তারকারাজি নিয়ে ‘ভৌগোলিকী’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছেন অঞ্জন ভট্টাচার্য। ‘প্রসঙ্গ-প্রেমের স্বরূপ’ শিরোনামে লিখেছেন আবদুল হক। এ সাময়িকীর একমাত্র রম্যরচনা অর্থাৎ রস রচনাটি লিখেছেন ভূপেন দে। যিনি এ রচনায়  ‘শ্রীমান কসটিক সোডা’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।

সাময়িকীর প্রতিটি লেখায় তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও মহাকাশ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে।

সাময়িকীটিতে সবচেয়ে বেশি অবদান শিক্ষার্থী ভূপেন দে ও শিব প্রসাদ ভট্টাচার্যের। তাদের লেখাও সবচেয়ে স্থান পেয়েছে।

‘খেয়াল’ নামের সাময়িকীটি প্রকাশে গঠিত সাত সদস্যের কমিটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘খেয়াল পরিচালক সমিতি’, যা লিপিবদ্ধ রয়েছে সাময়িকীটির ১৬৫ পৃষ্ঠায়। ওই পরিচালক সমিতিতে সাতজনের মধ্যে সভাপতি ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্রীযুক্ত ভুজঙ্গ ভূষণ সেন। বাকি ছয় সদস্যের মধ্যে চারজন ছিলেন হিন্দু শিক্ষার্থী এবং দুজন ছিলেন মুসলিম শিক্ষার্থী। সদস্য হিসেবে ছিলেন সলিল চন্দ্র গুহরায়, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, নির্মল কুমার রায়, অঞ্জন কুমার ভট্টাচার্য, আবদুল হক মোল্লা ও জিয়াউদ্দিন আহমদ।

সাময়িকীটির চার থেকে আট পৃষ্ঠাজুড়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক শ্রী ধীরেন্দ্র নাথ দাসের একটি লেখা। যার শিরোনাম ‘শুভ কামনা’। মূলত শিক্ষার্থীদের এ সাময়িকী প্রকাশের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েই শুভ কামনা শিরোনামের লেখাটি তিনি লিখেছিলেন। লেখাটি তিনি তার নিজ হাতে লিখেছেন বলে উল্লেখ করেন। লেখার এক স্থানে তিনি জানিয়েছেন, ‘গত বছর এমনই একদিনে ক্লাস অষ্টম শ্রেণির ছেলেরা ম্যাগাজিনের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশ করে।’

সাময়িকীটি যখন প্রকাশ পায় তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পাশেই স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে ছিল পানাম নগরী। বিদ্যালয়ের অদূরে ষোলপাড়া এলাকায় ছিল ঐতিহাসিক ললিতমোহন গ্রন্থাগার।

বিরল এ সাহিত্য সাময়িকীটি সম্পাদনা করেছেন প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন সহকারী শিক্ষক শ্রী হিরনময় ঘোষ। সহ-সম্পাদক ছিলেন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিব প্রসাদ ভট্টাচার্য ও ভূপেন দে। এ সাময়িকী বিদ্যালয়ের তৎকালীন সমৃদ্ধ ইতিহাসকে বিবৃত করে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের সাহিত্য চর্চার প্রতি অনুরাগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এটি বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার।