কোরবানির অন্তর্নিহিত বার্তা

কোরবানির ঈদ খুব কাছে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার নামে পশু জবাই করা এই ঈদের গুরুত্বপূর্ণ আমল, পরিভাষায় যাকে কোরবানি বলা হয়। কোরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ফজরের পর থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। ধর্মপ্রাণ মুসলমান কোরবানির মাধ্যমে পার্থিব ও পরকালীন প্রভূত কল্যাণ লাভ করে থাকে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যাতে তারা তাদের জন্য স্থাপিত কল্যাণগুলো প্রত্যক্ষ করে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোয় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে সেসব পশুতে, যা তিনি তাদের দিয়েছেন। সুতরাং সেই পশুগুলো থেকে তোমরা নিজেরাও খাও এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকেও খাওয়াও।’ (সুরা হজ ২৮)

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলসগুলোর মধ্য থেকে পশু কোরবানি করার চেয়ে কোনো আমল মহান আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় নয়। কেয়ামতের দিন কোরবানির পশু শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই মহান আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো।’ (জামে তিরমিজি ১৪৯৩)

কোরবানি অকুণ্ঠচিত্তে আল্লাহর আদেশ মেনে নেওয়ার এক পবিত্র প্রেরণা, নিজের চাওয়া-বাসনার ওপর আল্লাহর নির্দেশনাকে প্রাধান্য দেওয়ার এক অনন্য উপমা। মুসলিম উম্মাহর প্রচলিত কোরবানির পদ্ধতি ও রীতি হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ ও স্মরণ করেই সূচিত হয়েছে। জীবনসন্ধ্যায় পৌঁছে হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহতায়ালার কাছে একজন নেক সন্তান প্রার্থনা করেন। পবিত্র কোরআনে যে বর্ণনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে এমন পুত্র দান করো, যে হবে সৎলোকদের একজন। সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর যখন সে তার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। অতএব দেখ তোমার কী অভিমত। সে বলল, হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং সে তাকে কাত করে শুইয়ে দিল। অতঃপর যখন তারা উভয়ে আদেশ মান্য করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল। আর আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইব্রাহিম, তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা এবং আমি এক মহান কোরবানির (পশুর) বিনিময়ে তাকে (ইসমাইল) মুক্ত করলাম এবং পরবর্তীদের মধ্যে এই ঐতিহ্য চালু করলাম।’ (সুরা সাফফাত ১০০-১০৮)

যেকোনো ইবাদত বা নেক আমল কবুলের অন্যতম শর্ত হলো সেটি হতে হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তার নৈকট্য লাভের জন্য। অন্যথায় তা প্রতিদান ও প্রাপ্তিশূন্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কোরবানির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বিশেষভাবে মূল্যায়িত হয়ে থাকে। কেননা, কোরবানিতে মহান আল্লাহর জন্য পশু জবাইয়ের মধ্যে মানুষের জন্য আহারের বিধান রাখা হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে অনেকে প্রবৃত্তির শিকার হয়ে কোরবানির মূল চেতনা ও উদ্দেশ্যের কথা ভুলে যায়। বাহ্যিক প্রয়োজন পূরণ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও লৌকিকতা প্রদর্শন বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার কামনায় বিভোর থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে এগুলোর গোশত পৌঁছে না, আর এগুলোর রক্তও না, বরং তার কাছে তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছে। এভাবেই তিনি এসব পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো, তিনি তোমাদের হেদায়াত দান করেছেন বলে। যারা সুচারুরূপে সৎকর্ম করে তাদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা হজ ৩৭)

হজরত বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের এ দিনে আমরা সর্বপ্রথম যে কাজটি করব, তা হলো নামাজ আদায় করব। এরপর ফিরে এসে আমরা কোরবানি করব। যে ব্যক্তি এভাবে তা আদায় করল সে আমাদের নীতি অনুসরণ করল। আর যে ব্যক্তি আগেই জবাই করল, তা এমন গোশতরূপে গণ্য, যা সে তার পরিবার-পরিজনের জন্য আগাম ব্যবস্থা করল। এটা কিছুতেই কোরবানি বলে গণ্য নয়।’ (সহিহ বুখারি ৫৫৪৫)

কোরবানির মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহর প্রতি তাওহিদের বিশ্বাস পরিপূর্ণ ও নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। সুতরাং কোরবানি হতে হবে শিরক ও কুফরমুক্ত, কেবল আল্লাহর জন্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘(হে নবী,) আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে সরলপথ প্রদর্শন করেছেন, যা বিশুদ্ধ দ্বীন, ইব্রাহিমের মিল্লাত, যিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগৎগুলোর প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তার কোনো শরিক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই প্রথম আনুগত্যকারী।’ (সুরা আনআম ১৬১-১৬৩)

এভাবে অহংকার ও আত্মমুগ্ধতার শিকার না হয়ে আত্মসংযম, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, অসহায়-দরিদ্রদের সহায়তা ও ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা দেয় কোরবানি। অতএব, কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া এবং আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা ও বার্তাকে হৃদয়ে ধারণ করা এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা খুবই জরুরি।

লেখক : ইমাম ও খতিব, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ জামে মসজিদ, ঝিনাইদহ