প্রথম সেশনে তাসকিন-মিরাজের আঘাত, দ্বিতীয় সেশনে নাহিদ রানা ও তাইজুলের স্পিন বিষ সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিনটি কোনো একক নায়কের নয়, বরং এটি ছিল টিম বাংলাদেশের সম্মিলিত দাপটের। বোলারদের এমন ‘দলগত শিকার’-এর দিনে পাকিস্তানকে ২৩২ রানেই থামিয়ে দিয়েছে স্বাগতিকরা। প্রথম ইনিংসের ৪৬ রানের লিডকে পুঁজি করে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে মাহমুদুল হাসান জয়ের দারুণ ফিফটি বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে বড় স্বস্তি। দিনের একদম শেষ বলে মুমিনুল হকের বিদায়টা সামান্য আক্ষেপ জাগালেও, দিন শেষে ৩ উইকেটে ১১০ রান তোলা নাজমুল হোসেন শান্তর দলই রয়েছে ড্রাইভিং সিটে। ১৫৬ রানের লিড নিয়ে তৃতীয় দিন আরও বড় সংগ্রহের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।
সকালে ২১ রান নিয়ে খেলতে নামা
পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে প্রথম আঘাত হানেন তাসকিন আহমেদ। নিজের দ্বিতীয় স্পেলের শুরুতে দুর্দান্ত দুই ডেলিভারিতে সাজঘরে ফেরত পাঠান পাকিস্তানের দুই ওপেনার আবদুল্লাহ ফজল (১৩) ও আজান আওয়াইজকে (৯)। তাসকিনের একটু দেরিতে মুভ করা বলে উইকেটকিপার লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দেন ফজল। এরপরের ওভারে ভেতরের দিকে ঢোকা দারুণ এক ইনসুইঙ্গারে আওয়াইজকে পরাস্ত করেন তিনি, যা শর্ট লেগে ক্যাচ নেন মুমিনুল হক।
২৩ রানে ২ উইকেট হারানোর পর অধিনায়ক শান মাসুদ ও বাবর আজম মিলে ৩৮ রানের জুটি গড়ে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু প্রথম পরিবর্তন হিসেবে বল হাতে এসেই পাকিস্তানকে আবার ব্যাকফুটে ঠেলে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। শুরুতে ২১ রান করা শান মাসুদকে ড্রাইভ করতে প্রলুব্ধ করেন তিনি, যা কাভারে থাকা বদলি ফিল্ডার নাঈম হাসান দারুণ এক নিচু ক্যাচে পরিণত করেন। নিজের পরের ওভারে সৌদ শাকিলকেও (৮) ফাঁদে ফেলেন মিরাজ। সুইপ করতে গিয়ে ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় লিটনের গ্লাভসে।
৬১ রানে চার উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানের পক্ষে একমাত্র প্রতিরোধ গড়েন ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা বাবর আজম। সালমান আগাকে সঙ্গে নিয়ে পঞ্চম উইকেটে ৬৩ রানের জুটি গড়েন তিনি। দৃষ্টিনন্দন কিছু কাভার ড্রাইভ ও স্কয়ার কাটে বাবর তুলে নেন ক্যারিয়ারের ৩১তম টেস্ট ফিফটি। তবে ৬৮ রান করা বাবরকে বেশি দূর এগোতে দেননি তরুণ গতি তারকা নাহিদ রানা। রানার বাড়তি বাউন্সে পরাস্ত হয়ে মিড-অনে ক্যাচ দেন বাবর। এই নিয়ে চার ইনিংস বোলিং করে বাবরকে তিনবারই আউট করার কীর্তি গড়লেন নাহিদ রানা।
বাবর আজমের বিদায়ের পর পাকিস্তানের লোয়ার অর্ডার গুঁড়িয়ে দেওয়ার বাকি কাজটুকু সারেন তাইজুল ইসলাম ও নাহিদ রানা। দুজনেই শিকার করেন তিনটি করে উইকেট। অভিজ্ঞ বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল প্রথমে সালমান আগাকে (২১) স্কয়ার লেগ বাউন্ডারিতে ক্যাচ বানানোর পর বোল্ড করেন মোহাম্মদ রিজওয়ানকে (১৩)। এরপর হাসান আলীকেও মিড-অনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন তিনি।
চা-বিরতির ঠিক পরেই খুররম শেহজাদকে ফিরিয়ে নিজের দ্বিতীয় উইকেট নেন নাহিদ রানা। ৯ উইকেট হারিয়ে বসা পাকিস্তানের লিডের ব্যবধান কিছুটা কমান শেষ ব্যাটসম্যান সাজিদ খান। তাইজুলের এক ওভারে ৩টি বিশাল ছক্কাসহ ১৯ রান তুলে সাজিদ খেলেন ২৮ বলে ৩৮ রানের এক ক্যামিও ইনিংস। অবশেষে তাকেও ফ্লাই সিøপে ক্যাচ বানিয়ে পাকিস্তানকে ২৩২ রানে অলআউট করেন নাহিদ রানা। বাংলাদেশ পায় ৪৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড। প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে ফেরা ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়ের ওপর রান পাওয়ার একটা মানসিক চাপ ছিল। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে তানজিদ হাসান তামিম (৪) দ্রুত বিদায় নিলেও দমে যাননি জয়। প্রথম ইনিংসের ব্যর্থতা ভুলে দারুণ সব স্ট্রোক প্লে-তে মাত্র ৫৮ বলে তুলে নেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ফিফটি। আড়াই বছর পর বড় কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পাওয়া এই ফিফটিটি জয় সাজান ১০টি চারের সাহায্যে। ৫২ রান করে মোহাম্মদ আব্বাসের বলে বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে জয় যখন ফেরেন, বাংলাদেশের স্কোর তখন ২ উইকেটে ৮৬।
এরপর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে সঙ্গে নিয়ে দিনটি নিরাপদে পার করে দেওয়ার লড়াইয়ে নামেন মুমিনুল হক। সব ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু দিনের শেষ ওভারের চতুর্থ বলে ছন্দপতন ঘটে। খুররম শেহজাদের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে বসেন ৩০ রান করা মুমিনুল। এই আউটের মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটে দ্বিতীয় দিনের খেলার। ১৩ রানে অপরাজিত থাকা শান্তকে আগামীকাল নতুন দিনে নতুন সঙ্গী নিয়ে মাঠে নামতে হবে।
বাংলাদেশ কী করতে চায়, তার একটা ধারণা দিয়েছেন দিন শেষে নাহিদ রানা, ‘বর্তমানে একটাই পরিকল্পনা, যেহেতু আরও তিন দিন আছে, কাল যতক্ষণ পারব ব্যাট করব। ২০০-৩০০ এমন কোনো লক্ষ্য নেই। কালকের পর আরও দুই দিন আছে। তাই কাল (আজ) চেষ্টা করব সারা দিন ব্যাট করার।’