বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) জেলা-বিভাগের কোচ নিয়োগ নিয়ে এক আলোচনায় গত বৃহস্পতিবার বেশ আক্ষেপ করেন খালেদ মাহমুদ সুজন। বিসিবিতে নিজের সহকর্মীদের কাছে সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, ‘কোচ হিসেবে আব্দুল্লাহ আল মামুনের না থাকাটা সিরাজগঞ্জ ক্রিকেটের জন্য বড় ক্ষতি হয়ে গেল।’ সুজনের সঙ্গে অবশ্য ব্যক্তিগত পরিচয় নেই মামুনের। তবে দুই যুগের বেশি সময় ধরে ক্রিকেটার তৈরির কারিগর হিসেবে বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। সেভাবেই মামুনকে চেনেন সুজন। সম্প্রতি নতুন করে জেলা-বিভাগের কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিসিবি। এখানে প্রথম ধাপের বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন মামুন। এরপর ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এনেছেন তিনি। গতকালও মুঠোফোনে কথা বলার সময় কান্না থামছিল না তার। ভারী হয়ে যাওয়া কণ্ঠে বারবার বলার চেষ্টা করেন, ‘আমার কাছে প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমি মৃত। আমাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ক্রিকেটই আমার সব। অথচ সেটাই আমার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো।’
বিসিবির এই কোচ নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে বোর্ডের অন্দর মহলেই চলছে সমালোচনা। সেটা স্বীকার করেই গত বুধবার পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক শেষে সভাপতি তামিম ইকবাল বলেন, ‘কোচ নিয়োগ নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আমাদের মানতে হবে যে, আগের প্রক্রিয়া ঠিক ছিল না।’ একই সঙ্গে পক্ষপাতিত্বেরও কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, কোচ নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনুরোধ বা তদবির গ্রহণ করা হবে না। এটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। ফ্যাসিলিটি বা গ্রাউন্ডস নিয়ে সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু ক্রিকেটের মান নিয়ে কোনো সমঝোতা হবে না।’
তামিমের এমন কড়া বার্তার পরও কোচ নিয়োগ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে। আঙুল উঠেছে বিসিবির কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের দিকে। তাদের একজন হয়ে মামুন বলেন, ‘আমি জানি না সালাউদ্দিনের সঙ্গে আমার কীসের শত্রুতা। তার সঙ্গে তো আমি কখনো কাজ করিনি। তবে তিনি কোনোভাবেই চান না আমি সিরাজগঞ্জের কোচ হিসেবে থাকি। আমার পরিবর্তে নিজের পছন্দের একজনকে এখানে দায়িত্ব দিতে চান।’
সিরাজগঞ্জের ক্রিকেট সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগীয় দলে খেলতেন মামুন। ক্রিকেট ছাড়ার পর ২০১২ সালে কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০১৫ সালে বিসিবির সিরাজগঞ্জ জেলা কোচ হিসেবে নিয়োগ পেয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন মামুন। এদের একজন বলেন, ‘সালাউদ্দিন একসময় চেয়েছিলেন, তার ছেলে সিরাজগঞ্জের হয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলুক। কিন্তু মামুনের হাতে তখন বেশ কয়েজন ভালো ছেলে ছিল। এজন্য সেটা আর হয়নি। সেখান থেকেই দুজনের মধ্যে সমস্যা হতে পারে।’
বিসিবির হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটের এই প্রধান কোচের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে আরও। ৫৯টি জেলা ও ঢাকা মহানগরীর জন্য সর্বমোট ৬১ জন কোচ চেয়ে প্রথম ধাপে যে বিজ্ঞপ্তি দেয় বিসিবি, সেখানে ২১৮ জন আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ৩৮ জন লিখিত পরীক্ষায় পাস করেন। ব্যবহারিক ও ভাইভার পর ১৮ জন নির্বাচিত হন। ইতিমধ্যে তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ও ফোনকলের মাধ্যমে নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে বিসিবি। তবে এর অর্ধেক, অর্থাৎ ৯ জনই সালাউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এবং কয়েকজন মাসকো ক্রিকেট একাডেমির। এই দুই জায়গায় অতীতে কাজ করেছেন সালাউদ্দিন। বিসিবির কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট ছিলেন তিনি। অবশ্য এসব অভিযোগ আমলে নিতে চান না সালাউদ্দিন, ‘ঠিক আছে, আমাকে যারা চেনেন, তারা ভালোভাবেই চেনেন। আমার কারও কাছে এটা নিয়ে বলার কিছু নেই। যদি কোনো অভিযোগ করতে হয়, বোর্ডের মাধ্যমেই হবে। সবার কাছে এসে আমার এটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।’
বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগে সালাউদ্দিনের নামে পক্ষপাতের লিখিত কোনো অভিযোগ পড়েনি বলে দাবি করেন সদস্য সচিব সাইফুল ইসলাম, ‘না, আমাদের কাছে এমন কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই কোনো অভিযোগ করেনি। বাইরে এসব নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, কিন্তু আমরা কিছু জানি না।’ তবে বোর্ডের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিসিবির প্রধান নির্বাহী বরাবর নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার অভিযোগে বেশ কয়েকটি চিঠি দিয়েছেন জেলা-বিভাগের কোচেরা। এ বিষয়ে জানতে প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পাওয়া যায়নি তাকে।
সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগও উঠেছে। পরীক্ষার আগে গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, তিন কোচ সালাউদ্দিন, মিজানুর রহমান ও সোহেল ইসলাম ১৫টি করে প্রশ্ন জমা দেবেন। অথচ সব দায়িত্ব নেন সালাউদ্দিন। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একজন সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘তিন কোচের পাঠানো ৪৫টি প্রশ্ন থেকে বাছাই করে ২০টি চূড়ান্ত করার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার আগে হঠাৎ শুনি সিদ্ধান্ত
বদলে গেছে। সালাউদ্দিন দায়িত্ব চেয়ে নেন। কেন এমন হলো, এটা অবশ্য আমরা জানি না। তার করা প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা হয়।’
জাতীয় দলের সঙ্গে জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে সেখান থেকে এই প্রশ্ন পাঠান সালাউদ্দিন। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘প্রশ্ন কার কাছে ছিল, এটা আমি ছাড়া আর কেউ জানার কথা নয়। ঢাকায় কারও প্রশ্ন পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। লিখিত পরীক্ষায় কারও নাম দেখে খাতা দেখিনি। কোড নম্বরের মাধ্যমে নম্বর দিয়েছি। আর ব্যবহারিকের কথা যদি বলেন, আমি নিজে এই পরীক্ষা নিইনি। এর বাইরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য আমার আর কিছু করার নেই।’
সালাউদ্দিনের করা প্রশ্নে ৪০ নম্বরের মধ্যে ১৯ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস নম্বর (১৫) তুলতে পারেননি। রাজশাহীর এক আবেদনকারী সাদা খাতা জমা দিতে বাধ্য হন। ইংরেজিতে করা এই প্রশ্নপত্র নিয়ে বেশ নেতিবাচক আলোচনা হয়। এ জন্য দ্বিতীয় ধাপে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতে বাধ্য হয়েছে বিসিবি। গেম ডেভেলপমেন্টের সদস্য সচিব সাইফুল বলেন, ‘আমরা প্রথমবারের মতো এমন পরীক্ষা নিয়ে কোচ নিয়োগ করলাম। আমাদের মনে হয়েছে, কিছু জায়গায় আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল। আমরা এখন সেভাবেই গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। পরের ধাপে যে পরীক্ষা, আশা করি সেখানে প্রশ্নবিদ্ধ কিছু থাকবে না।’
গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ধাপে নিয়োগ আবেদনের সময় শেষ হয়েছে। জানা গেছে, ৩৫০-এর অধিক আবেদন জমা পড়েছে। এবার বোর্ড আর ভুল করতে চায় না। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই হবে প্রশ্ন। এবার আগে ব্যবহারিক পরীক্ষা নেবে বিসিবি। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সালাউদ্দিন থাকবেন বলে জানা গেছে। এইচপি দল দক্ষিণ আফ্রিকায়। আজ সেখানে প্রথম ওয়ানডে খেলতে নামবে। সে দলের প্রধান কোচের দায়িত্বে থাকা সালাউদ্দিন কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করেই রওনা করবেন।
