ট্রাফিক ব্যবস্থায় এআই শৃঙ্খলা ফিরাবে?

ঢাকায় হঠাৎ ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ফলে, চালক ও সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ছেন। আগে যেসব আইন পুরোপরি মানা হতো না, এখন সেগুলোই কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে অনেকে না জেনে, জরিমানা বা মামলার সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, নির্ধারিত স্থানে যাত্রী নামানো। অর্থাৎ রাস্তার মাঝখানে বা মোড়ে যাত্রী ওঠানামা করানো দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ধরা হচ্ছে। একইভাবে পিকআপ, ট্রাক বা অন্য যানবাহন দিয়ে যত্রতত্র মালামাল ওঠানো-নামানোও নিষিদ্ধ। এসব কারণে রাস্তার স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এই যুক্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন কড়াকড়ি করছে। আগে অনেকেই এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করলেও, এখন সেগুলো অমান্য করলে তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হচ্ছে। একইভাবে উল্টোপথে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা, কিংবা রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাওয়া এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি চলছে। এই পরিস্থিতির মূল কারণ হলো, দীর্ঘদিন ধরে থাকা শৃঙ্খলাহীনতা দূর করার চেষ্টা। আগে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ ছিল দুর্বল, ফলে মানুষ অভ্যাসগতভাবে নিয়ম ভাঙতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

ঢাকার রাস্তার অবস্থা খুব জটিল। অনেক জায়গায় নির্দিষ্ট বাসস্টপ বা ড্রপ-অফ পয়েন্ট থাকলেও, সেগুলো সবসময় পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত না বা পর্যাপ্ত নয়। ফলে চালকরা বাধ্য হয়ে মাঝরাস্তা বা কাছাকাছি কোথাও, যাত্রী ওঠানামা করান। এই বাস্তবতায় হঠাৎ করে ‘শুধু নির্ধারিত জায়গায় থামতে হবে’ নিয়ম মানা, অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে কিছুদিন কষ্ট হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটা শৃঙ্খলা আনতে সাহায্য করবে। সংক্ষেপে বলা যায়, ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব নিয়ম মানা চ্যালেঞ্জিং, কারণ পরিবেশ পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। কিন্তু নিয়মগুলো একেবারে অযৌক্তিকও না। সঠিক অবকাঠামো, সচেতনতা এবং সময় দিলে এসব নিয়ম ধীরে ধীরে সহজ হয়ে উঠবে। ঢাকার সড়কে এখন শুধু ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি, আইন প্রয়োগের একমাত্র ভরসা নয়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা এবং ই-প্রসিকিউশন প্রযুক্তি। ক্যামেরা গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংরক্ষণ করছে এবং আইন ভঙ্গের ভিত্তিতে নোটিস বা মামলা তৈরি করার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি সর্বাধুনিক পরিবর্তন। কারণ বহু বছর ধরে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ছিল মূলত জনবলনির্ভর। ট্রাফিক পুলিশ, সিগন্যাল, হাতের ইশারা, বাঁশি এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা এসবের মাধ্যমেই চলত পুরো ব্যবস্থা। কিন্তু দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা, যানবাহনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতার কারণে সেই প্রচলিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা ক্রমেই কমতে থাকে।

মেগা সিটির ট্রাফিক সমস্যার আরেকটি বড় কারণ হলো শৃঙ্খলার অভাব। ট্রাফিক আইন ভাঙা এখানে অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিকভাবে ‘স্বাভাবিক’ আচরণে পরিণত হয়েছে। ফাঁকা রাস্তা দেখলে সিগন্যাল অমান্য করা, কয়েক মিনিট সময় বাঁচাতে উল্টোপথে যাওয়া, জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি থামানো কিংবা রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠানামা এসবকে অনেক চালক অপরাধের চেয়ে কৌশল হিসেবেই বেশি দেখেন। ফলে শুধু আইন থাকা যথেষ্ট নয়; আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করাই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে। একটি ক্যামেরা ক্লান্ত হয় না, আবেগপ্রবণ হয় না, পরিচিত কাউকে ছাড় দেয় না এবং তদবির বোঝে না। ফলে আইন প্রয়োগে একধরনের নিরপেক্ষতা আনার সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ‘ম্যানেজ করে নেওয়া’ সংস্কৃতি প্রচলিত, সেখানে এটি স্বয়ংক্রিয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে পারে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতি নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বাস্তবতাও বুঝতে হবে। এটা কোনো জাদুর কাঠি নয়, যা একদিনেই ঢাকার যানজট ও বিশৃঙ্খলার সমাধান করে ফেলবে। বরং এটি একটি সহায়ক প্রযুক্তি, যার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর।

প্রযুক্তির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে, তথ্যের নির্ভুলতার ওপর। বাংলাদেশে এখনো  যানবাহন নিবন্ধনের তথ্য, মালিকানা পরিবর্তন এবং রেজিস্ট্রেশন তথ্য হালনাগাদ রাখার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। নকল নম্বর প্লেট, ভুল তথ্য কিংবা মালিকানা হালনাগাদ না হওয়ার কারণে ভুল ব্যক্তির কাছে নোটিস পৌঁছানোর ঝুঁকি থেকেই যায়। যদি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি ভুলভাবে জরিমানা পান এবং তার সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি কেবল সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারির নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠবে, নাকি এটি সত্যিকার অর্থে সবার জন্য সমান আইন নিশ্চিত করবে?

প্রয়োজন নাগরিকবান্ধব নগর পরিকল্পনা। ঢাকার যানজটের বড় কারণ, দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থা। মানুষ যদি নিরাপদ, আরামদায়ক ও সময়নিষ্ঠ গণপরিবহন না পায়, তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমবে না। রাস্তার সক্ষমতার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তখন কেবল বিশৃঙ্খলাকে আরও দক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, কিন্তু মূল সংকটের সমাধান করতে পারবে না। একইসঙ্গে পথচারীর জন্য অবকাঠামো উন্নয়নও জরুরি। ফুটপাত দখলমুক্ত, নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং নিশ্চিত ও গণপরিবহনের সড়কের নকশা আধুনিক করা ছাড়া টেকসই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু নগর পরিকল্পনার বিকল্প হতে পারে না। সেদিনই প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে নগরজীবনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।

ঢাকায় ট্রাফিক নিয়মের কড়াকড়ি শুধু সড়ক শৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সরাসরি কর্মঘণ্টা ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। যখন ট্রাফিক আইন সঠিকভাবে মানা হয় না, তখন যানজট আরও বেড়ে যায়। এর ফলে কর্মজীবী মানুষদের অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়ে এবং দৈনিক উৎপাদনশীলতা কমে যায়। যদি ট্রাফিক নিয়ম ঠিকভাবে মানা হয়, তাহলে যানজট কমবে, যাতায়াতের সময় কমবে এবং মানুষ তাদের কর্মঘণ্টা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে। এতে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।  ট্রাফিক শৃঙ্খলা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয় এটি কর্মঘণ্টা সাশ্রয়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সবশেষে বলা যায়, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থায় এআই-এর প্রয়োগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও এটি কোনো অলৌকিক সমাধান নয়। এটি একটি প্রয়োজনীয় সূচনা, যা সঠিকভাবে পরিচালিত হলে সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে পারে।