আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৭ এএম

৫ কেজি চালের অপেক্ষায় ঝরল ৩ প্রাণ। গত সপ্তাহে দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবরের শিরোনামটি দেখে দমকা বাতাস, বুকের ঠিক মধ্যখানে হু হু করে ওঠে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠার সঙ্গে, এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটনায় অক্ষম ক্ষোভ স্পর্শ করে। এরকম অবস্থার সম্মুখীন আমরা প্রথম হলাম, তা নয়। এর আগে বহুবার-বহুভাবে, অকালে-অবহেলায় ঝরে গেছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। এক একটি দুর্ঘটনা ঘটে, সংবাদমাধ্যমে খবর হয়। আমরা ভালোমন্দ বিচার করি, মনুষ্যত্বের মুক্তি কল্পনায় নতুন নতুন সতর্কবাণী শোনাই। তারপর সবকিছু ভুলে যাই বরাবরের মতো। পেছনে হারিয়ে যায় অসহায়, ক্ষুধার্ত মানুষের অব্যক্ত যন্ত্রণা-বেদনার করুণ কথা।

দুর্ঘটনার ক্ষত এখনো টাটকা, দগদগ করছে। সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে স্বস্তি দিতে স্বল্পমূল্যে চালসহ কিছু পণ্য কেনার সুবিধা সরকারের তরফে দেওয়া আছে। যাদের প্রয়োজন, তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নির্ধারিত বিনিময় মূল্যে সংগ্রহ করেন প্রয়োজনীয় পণ্য। গত সপ্তাহে রাজধানীর মিরপুরে ট্রাকের পেছনে এক লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন কিছু মানুষ। তাদের আশা ছিল সরকার নির্ধারিত মূল্যে টিসিবির চালসহ অন্যান্য পণ্য কিনবেন। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনের যে তীব্রতা থেকে তারা সেদিন দাঁড়িয়েছিলেন, অপেক্ষা করছিলেন তাদের সেই দাঁড়ানোসেই অপেক্ষা যে একেবারেই তাদের বঞ্চিত করে নিয়ে যাবে মৃত্যুর গাঢ় অন্ধকারে, তা কেউ ভাবেননি। সেদিন টিসিবির ট্রাকের পেছনের লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের ওপর আচমকা ভেঙে পড়ে কলেজের সীমানাপ্রাচীর। নিচে চাপ পড়ে মারা যান, তরতাজা তিনজন মানুষ। এ ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, আরও ৯ জন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সংবাদপত্রে বলা হয়েছে সীমানাপ্রাচীরটি অনেক দিন থেকে তার দুর্বল অবস্থান জানান দিয়েছিল। এ জন্য কলেজ কর্র্তৃপক্ষের আবেদনে সাড়া দিয়ে, ২০২২ সালে প্রাচীরটি সংস্কারে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কুড়ি লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু  অজ্ঞাত কারণে, সেই সংস্কারকাজ অগ্রসর হয়নি। ফলে হেলেপড়া প্রাচীরটি দুর্বল হতে হতে নিজের ভার ছেড়েছে, অসহায় কিছু মানুষের ওপর। যারা দুর্মূল্যের বাজারে একটু স্বস্তি খোঁজার আশায় দাঁড়িয়েছিলেন। স্বস্তির খোঁজে এসে যখন মানুষ প্রাণ হারায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন তুলে দেয় সামনে।

দুর্ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে দুদিন পর যাওয়ার সময় দেখেছি- সেখানে কয়েকদিন আগেই বড়সড় কোনো ঘটনা যে ঘটেছে, তা আন্দাজ করা কঠিন। চলতি পথে, দ্রুত রিকশার ছুটে চলার মধ্যে চোখে পড়ে ভেঙে পড়া প্রাচীরের ইটসহ অন্যান্য সামগ্রী জড়ো করে অন্যপাশের সড়কে জমা রাখা হয়েছে। প্রাচীরের শূন্যস্থান পূরণ করা হয়েছে টিনের বাউন্ডারি দিয়ে। ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়েছে ক্ষত। এতে করে এত মৃত্যু, এত প্রাণনাশের বীভৎস ক্ষত হয়তো লুকিয়ে রাখা গেল।  কিন্তু ওইসব অসহায় মানুষের মৃত্যু, যা তাদের পরিবারকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে তা আমরা কী দিয়ে ঢাকব? সময়ের প্রলেপে একদিন শোক কমবে। কিন্তু তাদের শূন্যতা পূরণ হবে? ভয়াবহ দিনটি নিহতদের পরিবার-স্বজন কী করে ভুলে যাবেন? তা কি ভুলে যাওয়া  যায়! পাঁচ বছরের যে শিশুটি তার বাবাকে হারিয়েছে এই দুর্ঘটনায়, সে কোনোদিন আর ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারবে না। বাবার পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যার জন্য, উদার আকাশের বিশালতা নিয়ে আর কে অপেক্ষা করবে? প্রতিদিনের মতো যখন এই পথ ধরে নিহতের স্বজনরা চলবেন, তখন কি হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো উঁকি দেবে না? যে ভরসায় তারা এসেছিলেন, সেই ভরসার জায়গাটি থেকে তো মাটি সরে গেল। যারা আহত হয়ে হাসপাতালে, সুস্থ হয়ে তারা যখন এই পথে যাতায়াত করবেন, তারাও কি ভয়ে কুঁকড়ে উঠবেন না!

তিন জন মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু হলো। এর দায় আমরা কেউ এড়াতে পারি না। অথচ প্রতিবেদন বলছে, মৃত্যুর দায় নিচ্ছে না কোনো পক্ষ। কলেজ কর্র্তৃপক্ষ বলছে, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ বা সংস্কারের দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের। যেহেতু তারা কাজ করায়নি, তাই দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে বর্তায়। অন্যদিকে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকেও এর দায় স্বীকার করা হয়নি। আমাদের প্রশ্ন, সীমানা প্রাচীরটি যখন ২০২১ সালেই সংস্কারের আবেদন উত্থাপন করা হয়েছিল, সেজন্য পরের বছর বাজেট বরাদ্দ হয়েছিল। তাহলে কাজটি কেন আটকে রয়েছে এত বছর? বরাদ্দের টাকা ছাড় হয়নি কেন? কাজটি করানোর বিষয়ে কেন কোনো পক্ষ উদ্যোগ  নেয়নি? একইসঙ্গে সীমানাপ্রাচীরটি নির্মাণ সময়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। একটি সীমানাপ্রাচীরের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল কতদিন, কতদিনে সংস্কার প্রয়োজন সেগুলো যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, সেদিকটিও মনে রাখতে হবে।

আমরা সীমাহীন সহানুভূতি নিয়ে প্রতিটি বিষয় বিবেচনা করি। কিন্তু সহনুভূতির সঙ্গে যদি কতর্ব্যকর্ম যথাযথভাবে পালিত না হয়, তাহলে এ রকম অস্বাভাবিক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। যার যে দায়িত্ব, সে তা পালন করছে কি না ভালোমন্দের বিচারে এদিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় দায়িত্বহীনতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার এমন নগ্ন বীভৎস চেহারা আমাদের পিছু না ছেড়ে সে তার পরিমণ্ডল বাড়িয়ে চলবে।

মংপুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে যতবার মৃত্যু এসেছে, যখন দেখেছি কোনো আশাই নেই, তখন আমি প্রাণপণে সমস্ত শক্তি একত্র করে মনে করেছি, ‘তোমাকে আমি ছেড়ে দিলাম, যাও তুমি তোমার নির্দিষ্ট পথে।’ তেমনি আমাদেরও নিজেকে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া হয়তো গত্যন্তর থাকবে না। আত্মকেন্দ্রিক সুখের অনুসন্ধানে অন্যের ঘাড়ে দোষ না চাপিয়ে, নিজের কাজ করে যাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার উপলব্ধি এখন বেশি প্রয়োজন।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত