আজ বাংলাদেশে বিশ্বাসের গভীর সংকট। নানা খাদ্যে ফরমালিন, কার্বাইড, বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভেজালের উপস্থিতি খাদ্যকে পুষ্টির উৎস থেকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতা শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয় এটি নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গভীর অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি একটি সুসংগঠিত অপশিল্পে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিক্রি হওয়া খাদ্যপণ্যের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার বাজারে বিক্রি হওয়া ৭৫ শতাংশেরও বেশি খোলা মসলায় মাটি, ইটের গুঁড়া, কাঠের গুঁড়া ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রঙ মেশানো হয়েছে। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত নমুনার ৬৮ শতাংশে মেলামাইন, ডিটারজেন্ট, ইউরিয়া বা অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি। মাছ সংরক্ষণে ফরমালিনের ব্যবহার এতটাই ব্যাপক হয়েছিল যে, এক পর্যায়ে এ দেশের মৎস্য খাত আন্তর্জাতিক বাজারে মারাত্মক সংকটে পড়ে। পোলট্রি শিল্পে নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোনের ব্যবহার শুধু মানবদেহে নয়, পরিবেশেরও ক্ষতি করছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল সংখ্যা নয়, এগুলো একটি জাতির স্বাস্থ্যের মৃত্যুঘণ্টা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাদ্যজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হয় এবং এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যা আরও ভয়াবহ, কারণ এখানে খাদ্যে ভেজালের কারণে সৃষ্ট রোগের হিসাব রাখার কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় ব্যবস্থা নেই। তবু যতটুকু গবেষণা হয়েছে, তা শিউরে ওঠার মতো। বাংলাদেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা গত দুই দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে খাদ্যে রাসায়নিকের ব্যবহারকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। শিশুদের মধ্যে বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া, মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের পেছনে খাদ্যে বিষাক্ত উপাদানের সরাসরি ভূমিকার কথা বারবার উঠে আসছে গবেষণায়।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, গত ১৫ বছরে দেশে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা ভেজাল ব্যবসায় জড়িত, তাদের মানসিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি স্রেফ লোভের ফল নয়, এর সঙ্গে মিশে আছে সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ও আইনের প্রতি ভয়হীনতা। এই মানসিকতা জন্ম নিয়েছে, দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে। ধরা পড়লেও সামান্য জরিমানা দিয়ে ছাড়া পাওয়া, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক সংযোগের সুরক্ষা সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে শক্তিশালী অপরাধী চক্র, যা এখনো নির্বিঘ্নে চলছে। আজ যে শিশু প্রতিদিন ভেজাল দুধ পান করছে- তার শরীরে সীসা, ক্যাডমিয়াম ও মেলামাইনের প্রভাব এখনই প্রকট না হলেও দশ বছর পর তার কিডনি, লিভার বা মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। এটি কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতার সংকট। যে জনগোষ্ঠী দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছে তারা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, সৃজনশীলতায় পিছিয়ে পড়বেই। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যজনিত অসুস্থতার কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর যে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং চিকিৎসায় যে ব্যয় হয়, তা জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে খাদ্য পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্য পরিদর্শন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি স্তরে নজরদারির কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যও এই কারণে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যে নিষিদ্ধ রাসায়নিকের উপস্থিতি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছে। এটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির গুরুতর সংকট। সমাধানের পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রথমত প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও এমন একটি অঙ্গীকার যেখানে প্রভাবশালী হলেও ভেজাল ব্যবসায়ী ছাড় পাবে না। দ্বিতীয়ত দরকার নজরদারি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন করা, মোবাইল ফুড টেস্টিং ইউনিট চালু করা এবং বাজার পরিদর্শন নিয়মিত ও অঘোষিত করা এখন সময়ের দাবি। তৃতীয়ত চাই আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগ। শুধু মামলা দায়ের নয়, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যে ব্যবসায়ী জেনেশুনে মানুষের খাবারে বিষ মেশাচ্ছে, তার সাজা হওয়া উচিত এমন যা দেখে অন্যরা শিউরে ওঠে। লাইসেন্স বাতিল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
শুধু দমনমূলক ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়। সমান্তরালভাবে দরকার গণসচেতনতার একটি ব্যাপক ও টেকসই অভিযান। খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের ডিজিটালাইজেশন, কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্যের উৎস ট্র্যাকিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত পরীক্ষা ব্যবস্থা এখন বিশ্বের অনেক দেশে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এই ধরনের উদ্যোগ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হলেও তার বিস্তৃতি এখনো সীমিত। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর ত্বরান্বিত করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, খাদ্যে ভেজাল রোধ শুধু খাদ্য মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার নয়। এটি স্বাস্থ্য, কৃষি, বাণিজ্য, আইন ও বিচার এবং স্থানীয় সরকার সবার সমন্বিত দায়িত্ব। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান, সমন্বিত অভিযান এবং একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস এগুলো না থাকলে সাইলোভিত্তিক কাজের ফলে অপরাধীরা সবসময় ফাঁক খুঁজে পাবে। নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের ভূমিকাও এখানে অনস্বীকার্য। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বহুবার এ দেশে ভেজালের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। কিন্তু প্রতিটি প্রতিবেদনের পর যা হওয়ার কথা তা হয় না কিছু অভিযান, কিছু মামলা, তারপর আবার সব আগের মতো। এই চক্র ভাঙতে হলে নাগরিক সমাজকে আরও সংগঠিত ও সোচ্চার হতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোকে আরও শক্তিশালী ভূমিকায় আসতে হবে। জনগণকে বুঝতে হবে যে, এটি তাদের অধিকারের লড়াই।