হুন্ডি নিয়ন্ত্রণ

চাই কার্যকর পদক্ষেপ

হুন্ডিতে টাকা পাঠানোর পুরনো পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল হুন্ডির কারবার। পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, নতুন এই ব্যবস্থা বেশি মারাত্মক। হুন্ডিচক্রগুলো বিদেশে বসেই অ্যাপসের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের এজেন্টের কাছে তথ্য-উপাত্ত পাঠিয়ে দেয়। আর সেই এজেন্ট প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেয় প্রণোদনাসহ অর্থ। এতে প্রেরক ও গ্রহীতা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার হুন্ডিতে প্রাপককে লাভ তুলনামূলক বেশি দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা এলে প্রণোদনা দেওয়া হয় আড়াই শতাংশ। আর হুন্ডিতে দেওয়া হয় ৬ থেকে ৭ শতাংশ। এতে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা স্বজনদের কাছে টাকা পাঠাতে হুন্ডির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। অতি সহজে টাকা সময়মতো পাঠানো ও প্রাপকের পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে বলে তারা হুন্ডির কারবারিদের ফাঁদে পা দেন। বার বার তাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা তুলে দেয়।

হুন্ডির এই ব্যবস্থা মুঘল আমলে প্রচলন হয়। তখন তা ছিল বৈধ। এরপর ব্যাংকিংব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ায় হুন্ডি বিতাড়িত হয়। দুষ্টচক্র আবার হুন্ডির বিস্তার ঘটিয়েছে। এখন এর নেটওয়ার্ক এতটাই বিস্তৃত যে, তারা ডিজিটাল ব্যবস্থাও কায়েম করে ফেলেছে। হুন্ডি কারবারিরা এখন কেবল রেমিট্যান্সের টাকাই দেশে পাঠায় না, দেশ থেকেও অর্থ পাচার করছে। দেশ রূপান্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যক্তিপর্যায় থেকে এখন তারা বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানের অর্থও বিদেশে পাচার করছে। বিভিন্ন দেশ বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় অর্থ পাচারকারীরা ওই দেশগুলোকে গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫টি দেশে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ, এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে পাচারকারীর তালিকায়। হুন্ডি কারবারিদের চক্র এতটাই সক্রিয় যে এরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্যে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে হুন্ডি ব্যবসা। ব্যাংকিং চ্যানেলে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে, তার তুলনায় হুন্ডিতে কত আসছে, সে হিসাব অজানা। তবে অনুমান করা যায়, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অর্থপ্রবাহ দৃষ্টিনন্দন ও আনন্দিত হওয়ার মতো হলেও হুন্ডির অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে এলে তার পরিমাণ অনেক বেড়ে যেত। দেশের প্রচলিত আইনে হুন্ডি অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এই অপরাধচক্র আইনকে তোয়াক্কাই করছে না। পুলিশের নানামুখী নজরদারি সত্ত্বেও তাদের ধরা যাচ্ছে না। পুলিশ বলছে, হুন্ডিচক্রের ১ হাজার ২২৩ কারবারি সক্রিয়। তাদের নেটওয়ার্কের জালে ধরা পড়ে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। পুলিশের তালিকায় তথ্য থাকার পরও কেন হুন্ডিচক্র নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না? সেটা কি পুলিশের গাফিলতি? নাকি ভিন্ন কোনো কারণ?

হুন্ডিতে প্রণোদনার পরিমাণ বেশি হওয়ায়, শ্রমজীবী প্রবাসীরা তাতে আকৃষ্ট হবেনই এতে সন্দেহ নেই। যে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে তাদের বিদেশে যেতে হয়, যে কঠিন শ্রম-সংগ্রামের মাধ্যমে তাদের কামাই-রোজগার, তাতে কিছু টাকা বেশি পাওয়ার প্রতি আকৃষ্ট হ্ওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ পথ থেকে তাদের ফেরাতে হলে কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কর্মী হিসেবে বিদেশে যাওয়ার ব্যয় অবশ্যই কমাতে হবে। ব্যাংকগুলোকে রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রণোদনা ৬/৭ শতাংশ করতে হবে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কর্তৃপক্ষের গভীর অনুসন্ধান জারি রাখতে হবে। কার কাছে হুন্ডির টাকা অ্যাপসের মাধ্যমে আসছে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। এমন একটি ডিজিটাল গেটওয়ে সৃষ্টি করতে হবে, যা দিয়ে হুন্ডিসহ অবৈধ আর্থিক লেনদেনের কারবার শনাক্ত করা যাবে। দেশের আর্থিক ক্ষরণ কমাতে হলে ব্যাকিং চ্যানেলের সংস্কারও জরুরি। দেশের অর্থনীতির ফুসফুস বলা হয় রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়কে। আমরা বলব, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে অর্থনীতির ফুসফুস হুন্ডি কারবারিদের খপ্পর থেকে মুক্ত হয়। সরকারকেই এটা করতে হবে অবিলম্বে।