কোরবানি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোরবানির শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা জরুরি। এটি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আত্মত্যাগ, আনুগত্য, তাকওয়া ও মানবিকতার এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর ঈদুল আজহা আমাদের সামনে হাজির হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু ত্যাগ করার মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় আমরা কোরবানির বাহ্যিক আয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিই। অথচ এর প্রকৃত শিক্ষা ও চেতনা আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হই। আগামী প্রজন্মকে সুন্দর, নৈতিক ও দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তুলতে কোরবানির শিক্ষা হতে পারে শক্তিশালী মাধ্যম।
কোরবানির ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইবরাহিম (আ.) মহান আল্লাহর নির্দেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। আর ইসমাইল (আ.)-ও আল্লাহর আদেশের সামনে বিনা দ্বিধায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পিতা-পুত্রের এই অনন্য আনুগত্য, ধৈর্য ও ত্যাগের ঘটনা কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে। এখান থেকেই আমরা শিখি, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ইচ্ছা, স্বার্থ ও ভালোবাসাকেও ত্যাগ করতে হয়।
আজকের শিশু-কিশোরদের সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অপব্যবহার, অশ্লীলতা, ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে তাদের মানসিক ও চারিত্রিক গঠন অনেক ক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় কোরবানির চেতনা তাদের হৃদয়ে জাগ্রত করতে পারলে তারা আত্মসংযমী, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।
শিশুদের মনে ছোটবেলা থেকেই কোরবানির প্রকৃত অর্থ তুলে ধরতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, কোরবানি মানে শুধু মাংস খাওয়া কিংবা আনন্দ-উৎসব নয়, বরং আল্লাহর আদেশ মানার এক মহান প্রশিক্ষণ। যখন একটি শিশু দেখবে, তার বাবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের অর্থ ব্যয় করছেন, পশু কোরবানি করছেন এবং গরিব-অসহায় মানুষের মধ্যে মাংস বিতরণ করছেন, তখন তার হৃদয়েও দানশীলতা ও সহমর্মিতার বীজ বপন হবে।
বর্তমানে অনেক পরিবারে কোরবানিকে কেবল সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কে কত বড় পশু কিনল, কার কোরবানি বেশি দামি, এসব প্রতিযোগিতা শিশুদের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। তারা মনে করতে শুরু করে, কোরবানি মানেই বাহ্যিক জাঁকজমক। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো বিনয়, তাকওয়া ও আন্তরিকতা। তাই অভিভাবকদের উচিত, সন্তানদের সামনে কোরবানির আধ্যাত্মিক দিকগুলো বেশি তুলে ধরা।
কোরবানি শিশুদের মধ্যে ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলে। আজকের পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ শুধু নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু কোরবানির শিক্ষা মানুষকে অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে শেখায়। পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার মানসিকতা একটি জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়। যদি আমাদের সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই ত্যাগের শিক্ষা পায়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ