আত্মঅহংকারের ক্ষতি

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৯ এএম

মানুষ বড় হতে চায়। সফলতা অর্জন করতে চায়। এগুলো স্বাভাবিক। তবে সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন মানুষ তার অর্জনকে নিজের শক্তির ফল মনে করতে শুরু করে। অন্যদের তুচ্ছ ভাবতে থাকে। নিজের মর্যাদাকে সবার ওপরে স্থান দেয়। তখন জন্ম নেয় আত্মঅহংকার। এটি নীরব একটি ব্যাধি। বাইরে থেকে সবসময় বোঝা যায় না। কিন্তু ভেতর থেকে মানুষের ইমান, চরিত্র ও আমলকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। তাই ইসলাম অহংকারকে আত্মিক ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কোরআনে মহান আল্লাহ অহংকার সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান ১৮)

এই একটি আয়াতই বুঝিয়ে দেয়, অহংকার আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় নয়। যে মানুষ আল্লাহর ভালোবাসা হারায়, তার প্রকৃত সফলতা অর্জন করা কঠিন।

অহংকারের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইবলিস। আল্লাহ যখন আদম (আ.)-কে সেজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন ইবলিস অস্বীকার করল। কারণ সে নিজেকে আদম (আ.)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল।

কোরআনে কারুনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাকে বিপুল সম্পদ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে মনে করেছিল, নিজের জ্ঞান ও যোগ্যতায় সে এসব অর্জন করেছে। ফলে সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে অহংকারে মেতে ওঠে। পরিণতিতে আল্লাহ তাকে তার সম্পদসহ ভূমিতে ধসিয়ে দেন। (সুরা কাসাস ৭৬-৮২)

ফেরাউনও ছিল আত্মঅহংকারের আরেকটি দৃষ্টান্ত। ক্ষমতার নেশায় সে নিজেকেই সর্বোচ্চ প্রভু বলে দাবি করেছিল। তার সেই গর্বই তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সে সাগরে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। তার ঘটনা যুগে যুগে মানুষের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে আছে।

আত্মঅহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণে বাধা দেয়। অহংকারী ব্যক্তি নিজের ভুল সহজে স্বীকার করতে চান না। অন্যের উপদেশ গ্রহণ করতে চান না। তিনি মনে করেন, তিনিই সব জানেন। অথচ ভুল স্বীকার করা এবং সত্য গ্রহণ করাই একজন মুমিনের গুণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অহংকারের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করা।’ (সহিহ মুসলিম)

এই হাদিসে অহংকারের দুটি লক্ষণ স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রথমত, সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা। দ্বিতীয়ত, অন্য মানুষকে ছোট মনে করা। যার মধ্যে এই দুটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সে অহংকারের রোগে আক্রান্ত।

অহংকার মানুষের চরিত্রকে নষ্ট করে। অহংকারী ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। অন্যের সাফল্যে কষ্ট পান। নিজের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসেন। সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। এসব স্বভাব মানুষকে ধীরে ধীরে একাকী করে দেয়।

পারিবারিক জীবনেও অহংকার ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনে। স্বামী যদি নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন, সংসারে শান্তি নষ্ট হয়। স্ত্রী যদি অহংকারে আক্রান্ত হন, সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। সন্তানদের মধ্যেও অহংকার তৈরি হলে তারা বড়দের সম্মান করতে শেখে না।

সমাজেও অহংকার বিভেদ সৃষ্টি করে। ধনী দরিদ্রকে অবহেলা করে। শিক্ষিত ব্যক্তি অশিক্ষিতকে তুচ্ছ করে। ক্ষমতাবান দুর্বলকে অপমান করে। অথচ ইসলাম মানুষকে তাকওয়ার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে শিখিয়েছে, সম্পদ বা পদমর্যাদার ভিত্তিতে নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন বিনয়ের সর্বোচ্চ আদর্শ। তিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল। তবুও তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসে খেতেন। দরিদ্রদের পাশে দাঁড়াতেন। শিশুদের সালাম দিতেন। নিজের কাজ নিজেই করতেন। তার জীবন আমাদের শেখায়, মর্যাদা বাড়লে বিনয়ও বাড়তে হবে। অহংকার থেকে বাঁচতে হলে সবসময় মনে রাখতে হবে, আমরা যা পেয়েছি, সবই আল্লাহর দান। আমাদের জ্ঞান, সম্পদ, সৌন্দর্য, শক্তি কিংবা সম্মান কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। আল্লাহ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে সব কেড়ে নিতে পারেন।

মৃত্যুর কথাও বেশি বেশি স্মরণ করা উচিত। যে মানুষ জানেন, একদিন তাকে মাটির নিচে চলে যেতে হবে, তিনি অহংকার করার সাহস পান না। কবরের মাটি ধনী ও গরিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।

নিজের ভুল খুঁজে দেখা এবং আত্মসমালোচনার অভ্যাস অহংকার দূর করতে সাহায্য করে। নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, দোয়া এবং সৎ মানুষের সঙ্গ মানুষের হৃদয়কে নম্র করে।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত