বিশ্বকাপের আঙিনায় স্পেন মানেই নান্দনিক পাসিং, শৈল্পিক ফুটবল আর মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের এক অপরূপ প্রদর্শনী। বিশ^ ফুটবলে ‘লা ফুরিয়া রোহা’ খ্যাত দলটির ইতিহাসের সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। সেবার জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি আলোনসো আর ইকার ক্যাসিয়াসদের নিয়ে গড়া স্পেনের সেই সোনালি প্রজন্ম পুরো বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছিল তাদের বিখ্যাত ‘টিকি-তাকা’ (পজেশন-ভিত্তিক ও ছোট ছোট পাসের ফুটবল) শৈলীতে। জোহানেসবার্গের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের ১১৬ মিনিটে ইনিয়েস্তার সেই ঐতিহাসিক জয়সূচক গোলে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল স্প্যানিশরা।
তবে ২০১০ সালের সেই মহাকাব্যিক বিশ্বজয়ের পর বিশ্বমঞ্চে স্পেনের গল্পটা কেবলই আক্ষেপ আর হতাশার। গত তিনটি বিশ্বকাপে তারা আর কোয়ার্টার ফাইনালের মুখ দেখেনি। ২০১৪ সালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এসে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়, আর ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে তাদের থামতে হয়েছে রাউন্ড অব ১৬-তেই (টাইব্রেকারে কপাল পুড়ে)। তবে পুরুষ দলের এই খরা কাটিয়ে স্প্যানিশ ফুটবলে নতুন করে বসন্ত এনে দেয় তাদের নারী ফুটবল দল। ২০২৩ সালের ফিফা নারী বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেনের নারীরা প্রথমবারের মতো বিশ্বজয়ের অনন্য রূপকথা রচনা করে। এবার পুরুষ দলের পালা; ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে উত্তর আমেরিকার মাটিতে নিজেদের দ্বিতীয় নক্ষত্রটি জার্সিতে যোগ করার লক্ষ্যেই মাঠে নামবে স্পেন।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে স্পেন ফুটবল দল বর্তমানে এক দুর্দান্ত ও অপ্রতিরোধ্য ফর্মে রয়েছে। ইউরো ২০২৪-এ সবকটি ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং সাম্প্রতিক দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে তারা বর্তমানে ফিফা র্যাংকিংয়ের ১ নম্বর স্থানটি দখল করে আছে। দলটিতে অভিজ্ঞ বিশ্বমানের তারকা এবং একঝাঁক উদীয়মান তরুণ প্রতিভার এক অসাধারণ সংমিশ্রণ ঘটেছে, যা তাদের এবার বিশ্বকাপের অন্যতম শীর্ষ ফেভারিটে পরিণত করেছে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের দর্শন : ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬০ বছর বয়সী লুইস দে লা ফুয়েন্তে স্পেনের ফুটবল চাকা সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ধীরগতির পজেশন ফুটবল ঘরানা বা ‘টিকি-তাকা’ থেকে কিছুটা বের হয়ে এসে আধুনিক, গতিশীল ও সরাসরি ফুটবল দর্শন প্রবর্তন করেছেন। ফুয়েন্তের কৌশলে মাঝমাঠের আধিপত্যের পাশাপাশি উইং বা মাঠের দুই প্রান্ত দিয়ে বিদ্যুৎগতির আক্রমণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিতে তার দর্শনের অন্যতম অংশ। খেলোয়াড়দের কঠোর ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা প্রদর্শনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেন তিনি, যার প্রমাণ মিলেছে ইউরো ২০২৪ ও ২০২৩ নেশন্স লিগের ট্রফি জয়ে।
মূল ভরসা লামিন ইয়ামাল ও রদ্রি : বর্তমান স্পেনের আক্রমণভাগের মূল নিউক্লিয়াস এবং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময় বার্সেলোনার তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামাল। ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর রানার্সআপ এই কিশোর উইঙ্গারের ডান প্রান্ত ধরে ক্ষিপ্র গতি, ডিফেন্স ভেঙে ফেলার ক্ষমতা এবং নিখুঁত পাসিং স্পেনের আক্রমণের প্রধান হাতিয়ার। মাঝমাঠে স্পেনের আসল ‘ইঞ্জিন’ হলেন ম্যানচেস্টার সিটির তারকা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার রদ্রি। পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ রাখা, প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করা এবং খেলা পরিচালনার মূল দায়িত্ব থাকবে তার কাঁধেই। আক্রমণভাগে ইয়ামালকে দারুণ সঙ্গ দিচ্ছেন দানি ওলমো এবং পেদ্রি। এ ছাড়া বাছাইপর্বে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ছয়টি করে গোল করা মিকেল মেরিনো এবং মিকেল ওয়ারজাবাল দলের অন্যতম ট্রাম্পকার্ড। রক্ষণভাগে পাউ কুবারসি এবং গোলপোস্টে ডেভিড রায়া বা উনাই সিমন দলকে ভরসা দিচ্ছেন।