বাংলাদেশ আজ এক রূপান্তর সন্ধিক্ষণের সম্মুখীন। ২০২৬ সাল কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সময়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের জন্য যেমন বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, ঠিক তেমনি ভঙ্গুর অর্থনীতি, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা এবং মূল্যস্ফীতির মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সুশাসন, সাহসিকতা এবং সময়োপযোগী সংস্কারের কার্যকর নীতি কাঠামো অপরিহার্য। জনজীবনের মূল সংকট হলো, মূল্যস্ফীতি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ হলেও মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৮.০৪ শতাংশ, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ওপর একটি বড় চাপ তৈরি করেছে। এর পেছনে বৈশ্বিক সংকটের চেয়ে দেশের অসাধু সিন্ডিকেট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) দুর্বলতাই বেশি দায়ী। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ট্র্যাকিং এবং টিসিবির মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর-জিডিপি অনুপাত যখন ৬.৮ শতাংশে নেমে এসেছে, তখন রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সুষ্ঠু সমন্বয় আবশ্যক। দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে তারল্য সরবরাহ বন্ধ করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। টিআইবির মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন একটি জরুরি কাজ। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রভাবমুক্ত করতে হবে এবং বেসরকারি খাতকেও এর আওতায় আনতে হবে। তথ্য অধিকার আইনকে প্রসারিত করে, সরকারি নোটশিট ও বেসরকারি তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এটি বিচারব্যবস্থার জন্যও প্রযোজ্য। প্রায় ৪০ লাখ বিচারাধীন মামলার জট জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করছে। ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’-এর মাধ্যমে মেধাবী বিচারক নিয়োগ এবং ভিডিও কনফারেন্সিং ও ই-ফাইলিংয়ের মতো ডিজিটাল পদ্ধতি এই সংকট সমাধানে সহায়তা করতে পারে।
অর্থনীতির মেরুদণ্ড ব্যাংক খাত আজ খাদের কিনারায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা (মোট ঋণের ৩৫.৭৩%), যা পরে ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনাকে অর্থনীতিবিদরা ‘কসমেটিক রিলিফ’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এ খাতের সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫’-এর কঠোর বাস্তবায়ন ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ অপরিহার্য। পরবর্তী ধাপে, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আগামী জুনের মধ্যেই যথাক্রমে ১০ ও ৫ শতাংশের নিচে নামানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে। এর পাশাপাশি, ২০২৭ সালের মধ্যে ‘আইএফআরএস-৯’ কার্যকর হলে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির জন্য পূর্বপ্রস্তুতির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তারুণ্যের শক্তি ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা জাতির মূল চালিকাশক্তি। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় এবং এ খাত থেকে বার্ষিক আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা সাইবার নিরাপত্তার মতো উন্নত দক্ষতায় আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, ‘ফ্রিল্যান্সার আইডি’র স্বীকৃতি এবং ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা এ খাতকে বদলে দিতে পারে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের ঘোষণা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস মডেলের আদলে ‘জেনারেল প্র্যাকটিশনার’ (জিপি) ব্যবস্থা চালু, এক লাখ নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
ঢাকার যানজট ও আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। যানজটে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটারে নেমে আসায়, প্রতিদিন ১৮ মিলিয়ন লিটার জ্বালানি অপচয় হচ্ছে এবং বছরে ক্ষতি হচ্ছে ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে ২,৩৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেল’-এর আওতায় ১০৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে ও বাস রুট রেশনালাইজেশন একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হবে। জ্বালানিতে ৬২.৫ শতাংশ আমদানিনির্ভরতা কমাতে ১৮০ বিলিয়ন ডলারের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এলএনজিতে ভর্তুকি কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কৃষিসেচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
পরিবেশগত সংকট ও সাইবার নিরাপত্তাহীনতা বর্তমানের অন্যতম মূল সমস্যা। ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের স্তর শূন্যে নেমে যাওয়া একটি বড় সতর্কসংকেত। বিশ্বব্যাংকের ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২১টি খাল ও ৫টি নদী পুনরুদ্ধার এবং ২৫ কোটি গাছ রোপণের উদ্যোগ আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গা চুক্তির ৩০ বছর পূর্তিতে, ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল যুগে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য ‘সাইবার প্রোটেকশন’ ও ‘ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর কঠোর বাস্তবায়ন এবং এআইভিত্তিক মনিটরিং সেলের মাধ্যমে গুজব ও ডিপফেক প্রতিরোধ করে নিরাপদ সাইবার পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য। উন্নয়নকে সচল রাখার জন্য সুশাসন হলো, সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ। যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা যায়, দক্ষ মানবসম্পদ যদি তৈরি করা হয় এবং জ্বালানি ও পরিবেশগত স্বনির্ভরতা অর্জিত হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিটি দূরদর্শী পদক্ষেপ, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারলে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে হাজির হবে। এটি শুধু সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথ।