চিকিৎসক যখন টার্গেট

চাই দায়িত্বশীল আচরণ

অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষ চিকিৎসক। নিজের পেশাগত অবস্থান থেকে সহমর্মিতার সঙ্গে সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন সেবা দেবেন এবং অসুস্থকে রোগমুক্ত করার চেষ্টা করবেন, এটাই প্রত্যাশিত। আর দ্রুত রোগমুক্তির স্বার্থেই রোগীর ঘনিষ্ঠজনদের কর্তব্য চিকিৎসককে দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সহযোগিতা দেওয়া। দুদিক থেকেই বিষয়টি পারস্পরিক সম্মান ও ধৈর্য বজায় রেখে করার কথা। সমস্যা হলো, এক্ষেত্রে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে চলেছে। চিকিৎসক হামলার শিকার হচ্ছেন। কিছু ঘটনার ধরন থেকে বোঝা যায়, কিছু হামলা পূর্বপরিকল্পিত। গুরুতর হামলায় চিকিৎসকের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আহমেদ হোসেন গত ২০ এপ্রিল বিকেলে দায়িত্ব পালন শেষে হেঁটে বাসায় যাওয়ার সময় পথে আকস্মিকভাবে দুজন এসে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। এই ঘটনার এক মাস হতে না হতেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হানকে উড়ো চিঠিতে পরিবারসহ মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। গত ১৫ মে শরীয়তপুরে রোগীর মৃত্যুর জন্য চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয় ডা. নাসির ইসলামের ওপর। আঘাত গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়। এর আগে চাঁদপুরে হামলার শিকার হন নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. বশির আহাম্মদ খান। তাহলে, সব চিকিৎসকের জন্য তার কর্মস্থল ও বাইরের জগৎ পুরোপুরি নিরাপদ থাকছে না। এতে চিকিৎসকরা ক্ষুব্ধ। আর নাগরিক সমাজ ও সরকার উদ্বিগ্ন। 

কিছু ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে চিকিৎসকরা নানা রকম সীমাবদ্ধতার মধ্যে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন রোগ-শোক নিয়ে প্রচুর মানুষ আসেন। সে তুলনায় সেবার সুযোগ বেশ সীমিত। সীমাবদ্ধতার দিকগুলো রোগী, তাদের স্বজন ও চিকিৎসকরা জানেন না, এমন নয়। তবে চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক বিষয়। চিকিৎসককে তার অবস্থান, জ্ঞান ও দক্ষতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে চিকিৎসা দিতে হয়। সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা অনেক সময় চিকিৎসকের অবস্থান ও সীমাবদ্ধতার দিকটি হয় বুঝতে পারেন না, বা বুঝতে চান না। আবার চিকিৎসকও হয়তো সবকিছু সেভাবে বুঝিয়ে বলতে পারেন না। এতে উভয়পক্ষের ভেতর বোঝাপড়ার অভাব ঘটে। কিছু ক্ষেত্রে যে দুই একজন চিকিৎসকের অসতর্কতা থাকে না, তাও নয়। তবে তার জন্য হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। আরেকটি বিষয় হলো, চিকিৎসকদের ওপর হামলাকারীদের শাস্তি হয় না বললেই চলে। এতে চিকিৎসকদের জন্য অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নিজের নিরাপত্তা না থাকলে কীভাবে একজন ডাক্তার সেবা দেবেন? জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো রোগী নির্দিষ্ট ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। কিছুটা অমানবিক ও অনৈতিক মনে হলেও ডাক্তারেরও সুযোগ আছে বিশেষ কোনো রোগীকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করার। তাহলে চিকিৎসক অনিরাপদ বোধ করলে কার ক্ষতি? দায় কার?

অসুস্থ মানুষ ও তাদের স্বজনদের আবেগ ও কষ্ট আমরা উপলব্ধি করি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাও বোঝেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকসহ হাসপাতাল কর্মীদের ওপর হামলা করে, ভয় দেখিয়ে চিকিৎসার পরিবেশ নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ধরনের কর্মকা- বেআইনি, যা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। চিকিৎসক ও রোগীর পারস্পরিক আস্থা মানবিক স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি। মানসম্মত সেবা পেতে হলে রোগীর স্বজনদের সংযত থাকতে হবে। চিকিৎসককে সহমর্মী হয়ে সেবা দিতে হবে। এর অন্যথা হলে, উভয়পক্ষ আইনের আশ্রয় নিতে পারে। আর সরকার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত চিকিৎসার পাশাপাশি সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।