দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গতকাল মঙ্গলবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। দুই দেশ ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও, রুশ প্রেসিডেন্টের এই সফরের কূটনৈতিক আলোচনার মূলে উঠে এসেছে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের চার দিনের মাথায় বেইজিংয়ে পা রাখলেন পুতিন। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা সবমিলিয়ে এই সফর আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। পাশাপাশি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের শীর্ষ দুই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানের বেইজিং সফর চীনকেও বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করাই পুতিনের এবারের চীন সফরের মূল লক্ষ্য। আবার দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হলো চীনের অর্থনৈতিক শক্তি এবং রাশিয়ার বিপুল তেল উৎপাদন সক্ষমতা। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে চীন-রাশিয়া গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে পুতিনের। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
রাশিয়ার সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে- পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা চীনের অবস্থানে নমনীয়তা আনতে পারে বলে আশা করছে রাশিয়া। বিশেষ করে পূর্বপরিকল্পিত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ পাইপলাইন প্রকল্পে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে চলমান আলোচনায় বেইজিং আরও নমনীয় হবে বলে মস্কোর প্রত্যাশা। নাম প্রকাশে এক রুশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনা প্রতিনিধিরা আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সহকারী ইউরি উশাকভও জোর দিয়ে বলেছেন, পাইপলাইন ইস্যুটি ‘আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।’ গত সোমবার সাংবাদিকদের উশাকভ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমার বিশ্বাস, দুই নেতার মধ্যে এ বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা হবে।’
তবে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, কোনো চুক্তির অগ্রগতি মূলত শি জিনপিংয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আর বর্তমানে এমন খুব কম ইঙ্গিতই মিলছে যে রাশিয়া সহজে কোনো সমঝোতা আদায় করতে পারবে। ব্লুমবার্গের ভাষ্য, ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকা অর্থনীতির কারণে রাশিয়া এখন চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পঞ্চম বছরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে এই সম্পর্ক মস্কোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মারকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের (মেরিকস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে চীনের আমদানির ৭০ শতাংশের বেশি ছিল খনিজ জ্বালানি। ২০২২ সালের পর থেকে চীনে রুশ তেল রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। তবে চীনের কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়া থেকে আমদানি চীনের মোট আমদানির মাত্র ৫ শতাংশ। অন্যদিকে রুশ বার্তা সংস্থা তাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়ার মোট আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছে চীন থেকে। আর রাশিয়া তার মোট রপ্তানির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি পাঠিয়েছে চীনে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ চীনের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যে এই পরিস্থিতি রাশিয়াকে সম্পর্কের ভারসাম্য নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ করে দিতে পারে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি জায়ান্ট গ্যাজপ্রমের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় মূল্যের প্রস্তাব করেছে গ্যাজপ্রম। সাইবেরিয়া থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে এই পাইপলাইন চীনে পৌঁছানোর কথা। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই গ্যাসের মূল্য নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে চায় রাশিয়া। ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর গত মার্চে চীন জানায়, তারা নিজেদের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রুশ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে অগ্রগতি আনতে চায়। এপ্রিলের শেষ দিকে গ্যাজপ্রমের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্সেই মিলার এবং চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান দাই হাউলিং বেইজিংয়ে বৈঠক করেন। সেখানে তারা ‘কৌশলগত অংশীদারত্বের উন্নয়ন’ নিয়ে আলোচনা করেন।
গত ৯ মে পুতিন বলেছিলেন, গ্যাস ও তেল খাতে সহযোগিতা সংক্রান্ত ‘প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ চীনের সঙ্গে একমত হওয়া গেছে। তিনি বলেন, যদি সফরের সময় আমরা সেগুলো চূড়ান্ত করতে পারি এবং পুরো প্রক্রিয়াকে শেষ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আমি খুবই সন্তুষ্ট হব। রাশিয়ার ভেতর দিয়ে পরিবহন করিডর তৈরির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অংশ। তবে ব্লুমবার্গের সূত্রগুলো বলছে, এখন চীনা কর্মকর্তাদের মধ্যে স্থলভিত্তিক ট্রানজিট রুট এবং আর্কটিক অঞ্চলের নর্দার্ন সি রুট সম্প্রসারণে আগ্রহ বাড়তে দেখছে মস্কো। ইরান যুদ্ধও এই পরিবর্তনে প্রভাব ফেলেছে।
পুতিন নিয়মিত চীন সফর করলেও, বৈশ্বিক রাজনীতিতে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। চীনে এটি পুতিনের ২৫তম সফর। বিশ্লেষকদের মতে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোর পর শি জিনপিং দেখাতে চাইবেন যে, চীন-রাশিয়া সম্পর্ক এখনো আগের মতোই দৃঢ়। কিংস কলেজ লন্ডনের নাতাশা কুহর্ট এএফপিকে বলেন, ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের দৃঢ় সম্পর্ক তাদের। এই সফর ওয়াশিংটনকে তা মনে করিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়। সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ঝাও লং বলেন, শিকে ‘প্রিয় বন্ধু’ বলে সম্বোধন করা পুতিনের জন্য এই ভাবমূর্তি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন- মস্কো নিশ্চিত হতে চায় যে, চীনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে রাশিয়া এখনো বিশেষ গুরুত্বের জায়গা ধরে রেখেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, আজ বুধবার পুতিন ও শি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসবেন। পরে সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডাতেও আলোচনা চালিয়ে যাবেন তারা। পুতিনের সঙ্গে রুশ প্রতিনিধিদলে রয়েছেন পাঁচ উপপ্রধানমন্ত্রী, আট মন্ত্রী এবং রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনা। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন ও বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও সফরে অংশ নিয়েছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ : গত সপ্তাহে ট্রাম্প ও শি যেসব জটিল ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার মধ্যে ছিল ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধও। চীনের রাজধানী ছাড়ার পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা চাই এই বিষয়টির সমাধান হোক।’ তবে ঝাও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান পুতিনের অগ্রাধিকার হলেও চীন ‘সমাধান প্রক্রিয়ার প্রধান রূপকার হয়ে উঠবে এমন সম্ভাবনা কম’। যেকোনো বাস্তব যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক রূপরেখা শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রধান পক্ষগুলোর উদ্যোগের ওপরই নির্ভর করবে, যোগ করেন তিনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র গত সোমবার বলেছেন, এ সপ্তাহে পুতিন ও শি ‘আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয়’ নিয়ে আলোচনা করবেন। যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার আহ্বান জানালেও ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর জন্য চীন কখনো রাশিয়ার নিন্দা করেনি। বরং তারা নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে উপস্থাপন করে। পাশাপাশি মস্কোকে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সামরিক যন্ত্রাংশ সরবরাহের অভিযোগও অস্বীকার করে বেইজিং।