জিলহজের প্রথম ১০ দিনে মুমিনের আমল

ইসলামি বর্ষপঞ্জির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাস জিলহজ। এ মাসের প্রথম দশ দিনকে মহান আল্লাহ বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। এই দিনগুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এ রাতগুলোর শপথ করেছেন। (সুরা ফাজর ২) হাদিসেও এ দশকের মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে জিলহজের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই।’ (আবু দাউদ ২৪৩৮)

এই দিনগুলোতে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই একজন মুমিনের উচিত, সময় গাফিলতিতে নষ্ট না করে ইবাদতে কাটানো। জিলহজের প্রথম দশ দিনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আমল উল্লেখ করা হলো।

নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া : আল্লাহর প্রিয় ইবাদতগুলোর অন্যতম হলো নামাজ। এই বরকতময় দিনগুলোতে ফরজ নামাজের পাশাপাশি সুন্নত ও নফলের প্রতিও যতœবান হওয়া উচিত। নামাজ মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে।

নফল রোজা পালন : জিলহজের প্রথম ৯দিন রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। বিশেষত ৯ জিলহজ তথা আরাফার দিনের রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আরাফার দিনের রোজা পূর্বের এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম ১১৬২) রোজা মানুষের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাকওয়া বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি তা চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্তরকেও গুনাহ থেকে হেফাজত করার শিক্ষা দেয়। যারা পুরো নয় দিন রোজা রাখতে সক্ষম নন, তারা অন্তত আরাফার দিনের রোজা রাখার চেষ্টা করতে পারেন। তবে হজ পালনকারীদের জন্য আরাফার ময়দানে অবস্থানকালে রোজা না রাখাই উত্তম। কারণ সেখানে দোয়া ও ইবাদতে শক্তিশালী থাকা বেশি জরুরি।

কোরআন তেলাওয়াত : কোরআন হলো মুমিনের হৃদয়ের আলো ও জীবনের পথনির্দেশিকা। জিলহজের প্রথম দশ দিন কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার উত্তম সময়। এ সময় নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করা উচিত। পাশাপাশি কোরআনের অর্থ বোঝা ও জীবন পরিচালনায় কোরআনের নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে।

জিকির : জিলহজের প্রথম দশদিন বেশি বেশি জিকির করা সুন্নত। বিশেষভাবে আল্লাহু আকবার, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়তে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে এমন কোনো দিন নেই, যেগুলো এই দশ দিনের চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ এবং যাতে আমল করা তার কাছে অধিক প্রিয়। তাই তোমরা এ দিনগুলোতে বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করো।’ (মুসনাদে আহমদ ৫৪৪৬)

তওবা-ইস্তিগফার : জিলহজের প্রথম দশ দিন তওবা ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ সময়। মানুষ ভুল-ত্রুটি ও গুনাহের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু উত্তম মানুষ সেই, যে গুনাহের পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। মহান আল্লাহ বান্দার তওবা অত্যন্ত পছন্দ করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২)

দান-সদকা : দান-সদকা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল। জিলহজের প্রথম দশ দিন দান করার সওয়াব আরও বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সবচেয়ে বেশি দানশীল। তিনি মানুষের প্রয়োজন পূরণে সর্বদা এগিয়ে আসতেন। দান মানুষের সম্পদ কমায় না, বরং বরকত বৃদ্ধি করে। (সহিহ মুসলিম ২৫৮৮)

কোরবানির প্রস্তুতি গ্রহণ : কোরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার শিক্ষা দেয়। ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর অনন্য ত্যাগের স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে কোরবানি। যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তাদের উচিত আন্তরিকতা ও ইখলাসের সঙ্গে এ ইবাদতের প্রস্তুতি নেওয়া। পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুস্থ ও উত্তম পশু বেছে নেওয়া জরুরি।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা : আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। অনেক মানুষ দুনিয়াবি ব্যস্ততা, অভিমান বা তুচ্ছ কারণে আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেন। অথচ এটি বড় গুনাহের কাজ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, মহান আল্লাহ তার রিজিক বৃদ্ধি করেন এবং আয়ুতে বরকত দান করেন।’ (সহিহ বুখারি ২০৬৭) জিলহজের এই বরকতময় দিনগুলোতে আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া উচিত। এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বড় মাধ্যম।

দোয়া ও মুনাজাত : দোয়া হলো মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। জিলহজের প্রথম দশদিন বিশেষত আরাফার দিনের দোয়ার ফজিলত অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।’ (মুয়াত্তা মালেক ৭২৬)

গুনাহ থেকে বাঁচা : জিলহজের প্রথম দশ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো সব ধরনের গুনাহ থেকে নিজেকে হেফাজত করা। কারণ এই সময়ে যেমন নেক আমলের সওয়াব বেশি, তেমনি গুনাহের ভয়াবহতাও বেশি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এই মাসগুলোতে তোমরা (পাপাচারে লিপ্ত হয়ে) নিজেদের ওপর জুলুম করো না।’ (সুরা তওবা ৩৬) বর্তমান যুগে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে গুনাহে জড়িয়ে পড়া খুব সহজ হয়ে গেছে। তাই বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা