জাতীয় বাজেটে ধারাবাহিকভাবে কমছে কৃষি খাতের বরাদ্দ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দ থাকলেও চলতি অর্থবছর পর্যন্ত তা নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে। এ বছর সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এ খাতের উন্নয়নে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কৃষি কার্ড প্রণয়ন, যান্ত্রিকীকরণসহ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, উদ্যোক্তা তৈরি, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা, কৃষি বীমা ও কোল্ড চেইন স্থাপন নানা পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতের জন্য বাড়তি বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি। ফলে নতুন অর্থবছরে কৃষি খাতে মূল বাজাটের ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দর দাবি জানিয়েছে তারা।
জানা গেছে, আসন্ন বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার। এ হিসাবে কৃষি খাতে সাড়ে ৯ শতাংশ বরাদ্দে টাকার পরিমাণ দাঁড়াবে ৮৮ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এই দাবির পেক্ষপাটে নানা যৌক্তিকতাও তুলে ধরেছে কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সম্মেলন কক্ষে কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : বাংলাদেশে কৃষির টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা’ শীর্ষক জাতাীয় সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি এবং অধ্যাপক মো. ওয়াকিলুর রহমান।
অনুষ্ঠানে কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি মো. আহসানুজ্জামান লিন্টুর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, বিশেষ অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
মূল উপস্থাপনায় কৃষি খাতের বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, কৃষি বীমা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং কৃষকের আয় বাড়ানোর জন্য নানা ধরনের কর্মপরিল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা এবং প্রণোদনা, সহজ ঋণ ও আর্থিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও সেচ সুবিধা, যান্ত্রিকীকরণ ও পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চায় সরকার, যা আসন্ন বাজেটে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি এসব কাজে বরাদ্দও বাড়াতে হবে।
উপস্থাপনায় সামগ্রিক বরাদ্দের সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানোরও দাবি করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা নতুন বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তাবয়নের জন্য কৃষিতে এবারে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এ জন্য কৃষি উপকরণ যেমন সার, বীজ, যন্ত্রপাতি ও সেচের জন্য ভর্তুকি বাড়াতে হবে। এ ছাড়া এসডিজির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে বরেন্দ্র এলাকায় কৃষি পুনর্জাগরণ, বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপন, কৃষি বীমা চালু, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি জোন প্রতিষ্ঠা, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতে স্টার্টআপ প্রকল্প নেওয়া, সমবায় সমিতির পুনর্জাগরণসহ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। এই কাজের জন্য অবশ্যই আসন্ন বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে কৃষিযন্ত্র নির্মাণ শিল্প স্থাপনে। স্থানীয়ভাবে শিল্প নির্মাণে উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়া, কৃষিযন্ত্রের যন্ত্রাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদন উৎসাহিত করতে কর রেয়াত ও আর্থিক সহায়তা, আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এ ছাড়া কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ ও রপ্তানি উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়। এ জন্য কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড়, অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ প্রক্রিয়াজাত এলাকা গঠন, মাছ ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করা, চিনি ও পাটশিল্পে বাড়তি গুরুত্ব, চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পকে ভঙ্গুর দশা থেকে তুলে আনা, মৌসুমি ফসল নষ্টরোধে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে সহায়তা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
পাশাপাশি অধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, জাত উন্নয়ন, পুষ্টিকর পশুখাদ্য উৎপাদন ও ভর্তুকি, রোগ প্রতিরোধে ভেটেরিনারি সেবা বিস্তারের মাধ্যমে পশুসম্পদ খাতের উন্নয়নে জোর দেওয়ার কথা তুলে ধরা হয়। পোলট্রি খাতের উন্নয়নে করপোরেট করহার কমানে, ফিডের দাম নিয়ন্ত্রণ, সহজ ঋণ ও প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানেরও সুপারিশ করা হয়। বাজেটে মৎস্য খাতের উন্নয়নেও আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এটি আগের অর্থবছরের এডিপির তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে কৃষি খাতে ১০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। এডিপিতে কৃষি খাতের ১২২টি চলমান প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন এবং প্রায় ২ হাজার ৯ কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দও রাখা হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বর্তমানে চাহিদার প্রকৃত তথ্য না থাকায় কৃষিপণ্য অপচয় হচ্ছে। কৃষক কার্ড চালু করার উদ্দেশ্য এ অপচয় কমানো। কৃষক কার্ড পাইলটিং হচ্ছে। পুরোপুরিভাবে চালু হলে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন হবে, কোনো কৃষিপণ্য অপচয় হবে না।