দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও অনলাইন লেনদেন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও কয়েক গুণ বেড়েছে। ব্যাংকগুলো প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠার সুযোগ নিচ্ছে সাইবার অপরাধীরা। প্রতিদিন ৬০ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে হাজারের বেশি সাইবার আক্রমণ বা সন্দেহজনক হিট আসে। এসব হামলায় সরাসরি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা না ঘটলেও গ্রাহকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকিতে পড়ছে বলে জানান সাইবার বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ফিশিং বা প্রতারণামূলক বার্তা, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৌশলে মানুষকে প্রভাবিত করে গোপন তথ্য বের করা, ডেটা ব্রিচ অনুমদিত তথ্য চুরি, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন আক্রমণ বা অনলাইন অ্যাপভিত্তিক সাইবার হামলা, ডিডস বা অতিরিক্ত ভুয়া অনুরোধ পাঠিয়ে সার্ভার অচল করে দেওয়ার চেষ্টা বেশি করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব হামলার মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য চুরি, অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশ এবং অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। একই সঙ্গে র্যানসমওয়্যার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে, যা পুরো ব্যাংকিংসেবা অচল করে দিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্টের সম্প্রসারণের কারণে ব্যাংকগুলো প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। এর সুযোগ নিচ্ছে সাইবার অপরাধীরা।
হ্যাকাররা বিভিন্ন দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির কারণ হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিকভাবে ব্যাংকিং খাত এখন সবচেয়ে বেশি সাইবার হামলার ঝুঁকিতে থাকা খাতগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বড় বড় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে র্যানসমওয়্যার, ডেটা চুরি ও ডিডস হামলার শিকার হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যাংকিংসেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২১ সালে বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে ‘গোস্ট’ সাইবার অপরাধীরা পুরনো ও সুরক্ষাহীন সফটওয়্যার এবং ফার্মওয়্যারের ইন্টারনেটভিত্তিক সেবায় নির্বিচার আক্রমণ করেছে। এ ধরনের আক্রমণের ফলে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু প্রতিষ্ঠান সাইবার ঝুঁকিতে পড়েছে। ‘গোস্ট’ র্যানসমওয়্যার পরিচালনাকারীরা সাধারণত ম্যালওয়্যার ফাইল, এনক্রিপ্টেড ফাইলের এক্সটেনশন, মুক্তিপণের নোট এবং ই-মেইল ঠিকানা পরিবর্তন করে থাকে, যার ফলে তাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই গ্রুপ ‘গোস্ট’, ‘ক্রিং’, ‘ক্রিপ্টার’, ‘ফ্যান্টম’, ‘স্ট্রাইক’, ‘হ্যালো’, ‘উইকরমি’, ‘এইচএসহারাডা’ এবং ‘র্যাপচার’ নামেও পরিচিত।
অর্থলোভী সাইবার গ্রুপ উন্মুক্ত কোড ব্যবহার করে সার্ভারের সুরক্ষা ত্রুটি কাজে লাগায়। বিশেষ করে ফোর্টিনেট কোল্ডফিউশন, মাইক্রোসফট এক্সচেঞ্জ সফটওয়্যারের পুরনো ও অনিরাপদ সংস্করণ তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে এখন আরও নিখুঁত প্রতারণামূলক বার্তা ও ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের পাশাপাশি ব্যাংক কর্মকর্তারাও প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন।
সম্প্রতি নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আইসিটি সিকিউরিটি পলিসি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত সার্কুলার ও চিঠির মাধ্যমে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা কার্যক্রম নিয়মিত অফসাইট ও অনসাইট পরিদর্শনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো সাইবারে ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত রিপোর্ট করার নির্দেশনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত নিরাপত্তা বাড়াতে নতুনভাবে সংস্কার করা, একাধিক ধাপে পরিচয় যাচায়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা, যেমন পাসওয়ার্ডের সঙ্গে ওটিপি ব্যবহার করা। এ ছাড়া তথ্যকে বিশেষ কোডে রূপান্তর করে সুরক্ষিত রাখা ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলা হচ্ছে। নিরাপত্তা দুর্বল থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, দেশের অনেক ব্যাংক ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সনদ অর্জন করেছে। আরও কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সাইবার বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ কবির দেশ রূপান্তরকে বলে, প্রতিদিন ৬০ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে হাজারের বেশি সাইবার আক্রমণ বা সন্দেহজনক হিট আসে। এসব হামলায় সরাসরি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া না হলেও গ্রাহকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকিতে পড়ছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ বাড়লেও দক্ষ জনবলের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ব্যাংকে পর্যাপ্ত সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নেই। এ ছাড়া গ্রাহকের অসচেতনতার কারণেও প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। তিনি বলেন, হ্যাকাররা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নামে একটি ডটচিহ্ন দিয়ে আপনাকে মেসেজে বলবে ওটিপি শেয়ার করবেন না। তখন আপনি নিজেই ওই লিংকে প্রবেশ করলে হ্যাক হয়ে গেলেন। কারণ ওই মেসেজ তো ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নয়। মানুষও যদি মোবাইল করে তথ্য চায় তবু দেওয়া যাবে না। হ্যাকাররা সিসি ক্যামেরার মতো করে আড়ি পেতে থাকে পরে সব তথ্য জেনে যায়।
ফিরোজ কবির বলেন, শুধু প্রযুক্তি নয়, সচেতনতার অভাবই এখন সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সরকারের উচিত দেশের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রস্তুত রাখা, যাতে বড় ধরনের সাইবার হামলা বা ঝুঁকির ঘটনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন আইসিটি পার্ককে কার্যকর গবেষণা, সাইবার প্রতিরক্ষা ও দক্ষ জনবল তৈরির কাজে ব্যবহার করার তাগিদ দেন।
এই সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, এখন শুধু সফটওয়্যার বা ফায়ারওয়াল নির্ভর নিরাপত্তা যথেষ্ট নয়। ব্যাংকগুলোকে রিয়েল-টাইম মনিটরিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক হুমকি শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের ইনসিডেন্ট রেসপন্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তারা বলছেন, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর দেশে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কমেনি। কারণ সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল ব্যবহার করছে।
জনতা ব্যাংকের আইসিটি বিভাগের প্রধান জেনারেল ম্যানেজার মো. আনিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমরা ভালো অবস্থানে আছি। আমাদের নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী আইসিটি টিম রয়েছে। তিনি মনে করেন, সাইবার হামলা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকের আস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের এই সময়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।