চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসী পুলিশের জালে ধরা পড়ায় ভয়ংকর অপরাধ চক্র বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ অনেকটাই ভেঙে ফেলতে পেরেছেন বলে দাবি জেলা পুলিশ কর্মকর্তাদের। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বড় সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যদের কোনোভাবেই আর মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।’
গতকাল বুধবার ভোরে যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তিন সহযোগীসহ ধরা পড়েন শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। আগের দিন (২৮ জুলাই) সন্ত্রাসী মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীতে জোড়া খুন, চান্দগাঁওয়ে আফতাব হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা হয়েছে। ধামা ইলিয়াছের বিরুদ্ধে আছে পাঁচটি হত্যাসহ ১৮টি মামলা।
পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধজগতে আলোচিত নাম হয়ে ওঠে ছোট সাজ্জাদ, রায়হান, ডেভিড ইমন, ধামা ইলিয়াছসহ আরও কয়েকজন। তাদের ‘গুরু’ বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। গেল দুই বছরে চট্টগ্রামে তারা কমপক্ষে এক ডজন টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটান। আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিরোধ, আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববিরোধের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পুরো চট্টগ্রামকে অস্থির করে রাখে বড় সাজ্জাদ বাহিনী। সম্প্রতি ১০ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রাম নগরে শীর্ষ এক ব্যবসায়ীর বাড়ি লক্ষ্য করে সাব-মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ, ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বাকলিয়া থানা এলাকায় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, তারও দেড় মাস আগে রাউজান উপজেলায় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন।
পুলিশ জানায়, ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা থেকে গ্রেপ্তারের পর ছোট সাজ্জাদ এখন কারাবন্দি। সাম্প্রতিক সময়ে রায়হান ও ডেভিড ইমন পুরো বাহিনী নিয়ে চট্টগ্রামে একের পর এক খুন ও চাঁদাবাজি, গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটাতে থাকেন। ইমন-রায়হানকে গ্রেপ্তার প্রশ্নে অসহায় হয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনদের চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করে জেলা পুলিশ।
পুলিশের পাওয়া তথ্য অনুসারে, পুলিশের তৎপরতার মুখে বাহিনীর সদস্যদের আত্মগোপনে যাওয়ার পরামর্শ দেন বড় সাজ্জাদ। ‘গুরুর’ নির্দেশনা পেয়ে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন ডেভিড ইমন। কিন্তু ইতিমধ্যেই সন্ত্রাসী রায়হান, ডেভিড ইমনের গতিবিধি চট্টগ্রাম জেলা ও গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারিতে চলে আসে। একপর্যায়ে বুধবার ভোরে যশোরে গিয়ে তিন সহযোগীসহ ধরা পড়েন ডেভিড ইমন।
গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসপি মাসুদ আলম বলেন, ‘কখনো দুবাই, কখনো ভারতে অবস্থানের মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে ইমন দেড় বছর ধরে পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিলেন। অবশেষে সে পুলিশের জালে ধরা পড়েছে। বাকি রইল রায়হান। তাকেও শিগগির ধরা হবে। অল্প সময়ের মধ্যে শীর্ষ দুই সন্ত্রাসী ধরা পড়ায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের চেইন অব কমান্ড প্রায় ভেঙে পড়েছে।’
জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তার দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ডেভিড ইমনের গ্রুপ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করতেন। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত বাহিনীপ্রধান বড় সাজ্জাদের কাছে পাঠাতেন। সেখানে ডেভিড ইমনের জন্য ‘আজহার খান’ নামে তৈরি করা হয়েছে আধার কার্ড।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানকে গ্রেপ্তারের জন্য নোয়াখালীতে অভিযান চালানো হয়েছিল। অল্পের জন্য সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তাদের বাহিনীর সব সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হবে।’
জানা গেছে, ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মোহাম্মদ মুসার ছেলে। নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানার আতুরারডিপো এলাকায় তাদের বাসা। পুলিশ তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৪টি মামলার তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে তিনটি হত্যাসহ ১০টি মামলা নগরে। বাকি তিনটি হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ি উপজেলায়। পুলিশ জানায়, আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের বাহিনীর সদস্যরা। ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন ডেভিড ইমন। কয়েকদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে যান। ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ গভীর রাতে ডেভিড ইমনের নেতৃত্বে নগরের এক্সেস রোডে প্রাইভেট কারে গুলি করে দুজনকে হত্যা করা হয়।
তথ্য সূত্র বলছে, যে কার লক্ষ্য করে সেদিন গুলি চালানো হয়েছিল ওই কারে ছিলেন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের বায়েজিদ থানাধীন হাজীপাড়া এলাকায় খুব কাছে থেকে গুলি করে বাবলাকে খুন করা হয়। রায়হানই বাবলাকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। ডেভিড ইমন-রায়হানের হাতে ওই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গায় সন্ত্রাসী আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর খুন হন।
তথ্যসূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজের আধিপত্য বিস্তারে বড় সাজ্জাদ তার বাহিনীকে তিনটি জোনে ভাগ করে তিনজনকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন। রাউজান থেকে বোয়ালখালী পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পায় রায়হান ও তার ২০ জনের টিমের। চট্টগ্রাম শহরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে বোরহান। তার টিমে আছে বেলাল, হাসান, নাঈম, সোহাগ ও সাজ্জাদের বন্ধু সরওয়ার। ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও চট্টগ্রাম শহরে চাঁদা আদায়ের দায়িত্বে আছে ডেভিড ইমন। এই গ্রুপে আছে ৩০ জনের মতো।
জানা গেছে, দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ইমন সবার বড়। তার বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে এসে অনুশীলন করতেন। পরে নগরের অক্সিজেনে খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে। অনুশীলন করতেন কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেননি ইমন। ২০২০ সালে করোনার পর তিনি পুরোপুরি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০২২ সালে ওমানে যান ইমন। বছরখানেক পর দেশে ফিরে আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান তিনি। তখন নগরের আতুরারডিপো এলাকায় অবস্থান শুরু করেন। সেখানেই শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
পুলিশ বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে ইমনের একটি ছবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় মোটরসাইকেল ভাড়া ও সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ের দায়িত্বও ছিল ইমনের। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজিদ থানার একটি দস্যুতার মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইমন। কিন্তু গ্রেপ্তারের মাত্র ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান।
তিন সহযোগীসহ ডেভিড ইমন কারাগারে : শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রামে হত্যা ও অস্ত্র আইনের তিনটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সায়মা আফরিন হিমার আদালত এ আদেশ দেয়।
এ ছাড়া ইমনের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আরও তিনজনকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য তিনজন হলেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মৈয়শাতুয়া এলাকার মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে মো. শামীম (২৮), ঢাকার শ্যামপুর থানার করিমুল্লাবাগ পোস্তাগোলা এলাকার মো. জাফরের ছেলে আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫) ও নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার সাহারপাড় এলাকার মো. বেলায়েত হোসেনের ছেলে মো. সাফায়েত হোসেন (২৪)।
