দুই কিমি পরপর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক

খুলনার ব্যস্ততম বেতগ্রাম-পাইকগাছা-কয়রা মহাসড়কের প্রতি ২ কিলোমিটার পরপর রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় ধরে সড়ক প্রশস্তকরণ ও বাঁক সরলীকরণের কাজ চললেও প্রকেল্পর বড় একটি অংশ এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। ফলে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ভারী যানবাহন ও সাধারণ মানুষ। এসব বাঁকে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, নকশা বিতর্ক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে এই মহাসড়কের বাঁকে বাঁকে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ঠিকাদারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতায় মাঝে মাঝে কাজ থমকে থাকে। সম্প্রতি ভূমি অধিগ্রহণের টাকা না পাওয়ায় সড়কের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে উপকূলের তিন উপজেলার লাখো মানুষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল তালার আঠারো মাইল থেকে কয়রা পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার সড়কের ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সরলীকরণ ও সড়ক প্রশস্ত করা। তবে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ ও বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিক ভবন অপসারণে আইনি জটিলতা, কপিলমুনিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে স্থানীয়দের বিরোধিতার কারণে কাজ থমকে ছিল। চার দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর সাতক্ষীরার তালা অংশের কাজ কিছুটা শেষ হলেও পাইকগাছা ও কয়রা অংশের কাজ আটকে যায়। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জমির মালিকরা পাইকগাছা উপজেলার কার্তিকের মোড়সহ অন্তত ১০টি পয়েন্টে বাঁশের বেড়া ও লাল কাপড় টাঙিয়ে সড়ক অবরোধ করে।

খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা চলছে। পাইগাছা উপজেলার কপিলমুনিতে ১টি, গোলাবাটিতে ১টি, গোপালপুরে ১টি, গজালিয়ায় ৩টি, মৌখালী ৩টি ও কয়রা উপজেলার মদিনাবাদে ১টিসহ মোট ১০টি পয়েন্টের ভূমি মালিকদের অধিগ্রহণের টাকা জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে কয়রা-বেতগ্রাম সড়ক উন্নয়নের প্রকল্প ২০১৯ সালে একনেক সভায় অনুমোদন পায়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে খুলনার কয়রা-বেতগ্রাম আঞ্চলিক সড়কের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি নাম দেওয়া হয় ‘কয়রা-বেতগ্রাম সড়ক যথাযথ মানে উন্নীত ও মজবুতিকরণ প্রকল্প’। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুনে। শুরুতে প্রকল্পের বরাদ্দ হয় ৩৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ পরবর্তীতে ৩৭৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। তবে ৬ বছরেও সড়কের কাজ শেষ হয়নি। সর্বশেষ বর্ধিত মেয়াদ অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা। যদিও এ পর্যন্ত কাজটির অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ।

স্থানীয়রা জানান, সড়কের কাজ বন্ধ থাকায় বেতগ্রাম থেকে পাইকগাছার শিবসা সেতুর দক্ষিণ পাশের সংযোগ সড়ক, পাইকগাছার কপিলমুনি বাজার, গদাইপুর, পাইকগাছা বাসস্ট্যান্ড, আলমতলা ও গজালিয়া কালভার্ট, কয়রা উপজেলার হাতিয়ার ডাঙ্গা, আমাদি বাজার এলাকায় কাজ অসম্পন্ন রয়েছে। এসব এলাকার সড়ক কাদাপানিতে একাকার। তাই এ এলাকার বাঁকগুলো আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

জমির মালিক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘জেলা প্রশাসন থেকে ক্ষতিপূরণের চেক প্রস্তুত থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে আমরা কোনো টাকা পাইনি। নগদ টাকার না পাওয়ায় নিজেদের স্থাপনা বা দোকান আমরা সরাতে পরছি না। তাই উপায় না দেখে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বাঁশের বেড়া দিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছি।’

পাইকগাছা উপজেলার কার্তিকের মোড়ের শাহিনুর সরদার বলেন, ‘জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আমরা আজও পাইনি। এ বিষয়ে আমরা খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগে অভিযোগ করেছি। তারা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন। আর কত হয়রানির শিকার হবো তা জানি না।’

স্থানীয় ট্রাকচালক হায়দার হোসেন জানান, বেতগ্রাম-পাইকগাছা-কয়রা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানের বেহাল দশা। কোথাও কোথাও খানাখন্দ ও কাদাপানিতে একাকার। ৬৫ কিলোমিটার সড়কে ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। অর্থাৎ গড়ে দুই কিলোমিটার পরপরই বাঁকের দেখা মেলে। এসব বাঁকে একটু অসতর্ক হয়ে গাড়ি চালালেই বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, ‘২০২০ সালে বেতগ্রাম থেকে কয়রা পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সরলীকরণ ও প্রশস্তকরণের মেগা প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। সাতক্ষীরার তালা অংশের কাজ অনেকটা শেষ হলেও পাইকগাছা ও কয়রা অংশের ১০টি পয়েন্টের বাঁক সরলীকরণের কাজ এখনো অসমাপ্ত আছে। সম্প্রতি ভূমি মালিকরা ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়ায় বিক্ষুব্ধ হয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। অধিগ্রহণের জমির টাকার চেক প্রস্তুত থাকলেও জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর না হওয়ায় অর্থ প্রদান করতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে দ্রুত বিষয়টি সমাধান করে সড়কের কাজ চালুর চেষ্টা চলছে।’