কক্সবাজারের চকরিয়ায় সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা ও অস্ত্র আইনের দুটি মামলায় পৃথক পৃথক রায় ঘোষণা করেছে আদালত।
এতে হত্যার দায়ে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, নয় জনকে যাবজ্জীবন দিয়েছে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। একই সাথে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো ১ বছরের কারাদণ্ডের রায় দিয়েছে বিচারক।
এছাড়া অস্ত্র আইনের মামলার পৃথক দুটি ধারায় ১৩ জনকে ১৭ বছরের স্বশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে একই আদালত। একই সাথে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ না মেলায় উভয় মামলায় ৫ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালতের বিচারক।
হত্যাকাণ্ডের মাত্র ২০ মাসের মধ্যেই বুধবার (২০ মে) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী ওই রায় ঘোষণা করেন।
হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের পূর্ব ডুমখালী গ্রামের জাফর আলমের ছেলে মো. হেলাল উদ্দিন, একই ইউপির ১ নং ওয়ার্ডের ছগিরমাহ কাটার মৃত কামাল হোসেনের ছেলে নুরুল আমিন প্রকাশ আমিন, ২ নং ওয়ার্ডের রিজার্ভ পাড়ার আবদুল মালেকের ছেলে মো. নাছির উদ্দিন ও একই গ্রামের আবুল কালাম কবিরাজের ছেলে মোর্শেদ আলম। এদের মধ্যে মোর্শেদ পলাতক রয়েছে।
একই মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডিতরা হলেন, চকরিয়া পৌরসভার কাহারিয়া ঘোনার নুরুল কবিরের ছেলে জালাল উদ্দিন (বাবুল) মৃত শহর মুল্লুকের ছেলে মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, ভরা মুহুরির আকতার আহমদের ছেলে মো. আনোয়ার হাকিম, কৈয়ারডেবার পূর্ব মাইজপাড়ার মোজাফ্ফর আহমদের ছেলে মো. জিয়াবুল করিম, নুরুল আলম প্রকাশ ফুরকানের ছেলে মো. ইসমাঈল হোসেন (হোসেন), মৃত নুরুল আলমের ছেলে এনামুর হক এনাম (তোতা এনাম), ডুলহাজারা ইউনিয়নের পূর্বডুমখালী গ্রামের মৃত নুরুল ইসলাম (লালু) এর ছেলে মোহাম্মদ এনাম, রঙমহল গ্রামের নুর আলম মিস্ত্রীর ছেলে মো. কামাল প্রকাশ বডি কামাল, ছগিরশাহ কাটার গোলাম কাদেরের ছেলে আবদুল করিম প্রকাশ মো. করিম৷ এদের মধ্যে মো. করিম পলাতক রয়েছেন।
অপরদিকে অস্ত্র মামলায় হত্যা মামলায় দণ্ডিত সবাইকে দুটি পৃথক ধারায় ১০ বছর ও ৭ বছর করে মোট ১৭ বছর স্বশ্রম দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দোষ প্রমানিত না হওয়ায় উভয় মামলা থেকে মোহাম্মদ ছাদেক, আনোয়ারুল ইসলাম ( বাট্টাইয়া), শাহ আলম, আবু হানিফ ও মিনহাজ উদ্দিনকে খালাস দিয়েছে আদালত।
আদালত ও পুলিশ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাত দেড়টার দিকে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩)।
এর একদিন পর ২৫ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে হত্যা ও অস্ত্র আইনে দুটি পৃথক মামলা করেন। ওই মামলায় ১৭ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। কিন্তু পুলিশ তদন্ত করে এজাহারভুক্ত ৬ জনকে বাদ দিয়ে নতুন করে ৭ জনকে অভিযুক্ত করে মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
সেই অভিযোগপত্র আদালত গ্রহন করে বিচারকাজ শুরু করে। পরে ৫২ জন স্বাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহন ও জেরা শেষ করে মাত্র ২০ মাসের মধ্যে এই রায় ঘোষণা করা হয়। আর ওই রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় ১২ জন আসামি উপস্থিত থাকলেও এদের মধ্যে মো.ছাদেক বেকসুর খালাস পান।
এই বিষয়ে মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবি সেজান এহেছান বলেন, মামলার রায় ঘোষণার সময় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত মোর্শেদ ও সাজাপ্রাপ্ত মো. করিম ছাড়া বাকি ১১ জনই কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, এই রায়ের মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তরা আগামী ৭ দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন বলে মত দিয়েছেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. খোরশেদ আলম বলেন, এটি একটি জঘন্যতম হত্যার ঘটনা। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সঙ্গবদ্ধ ডাকাত দলের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন একজন সেনা কর্মকর্তা। এই রায় তাই দুর্বৃত্তদের জন্য উদাহারন হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ে সন্তুষ্ট বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে রায়ের পূর্নাঙ্গ কপি পেলে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানান আসামিপক্ষের একাধিক আইনজীবি।