মৃত্যুর বেদনা আর বেঁচে থাকার যন্ত্রণা

মাত্র দুই মাসে সাড়ে চারশ শিশুর বেশি মৃত্যু এর আগে দেখেনি বাংলাদেশ। অসহ্য যন্ত্রণায় যখন মানুষ কাতরাতে থাকে, অসহায় স্বজন যখন দেখে সাহায্য করার কেউ নেই, কোনো উপায় নেই যন্ত্রণা লাঘব করার, তখন দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে একটা কথা বেরিয়ে আসে এই মৃত্যু যন্ত্রণার চাইতে মৃত্যুই ভালো। কিন্তু বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে এই কথা চলে না। যন্ত্রণাকাতর মানুষের দিকে তাকিয়ে, সন্তানের অসুস্থতা সব বাবা-মাকেই অস্থির করে তোলে। কোথায় যাবেন, কার কাছে যাবেন, কী করলে তাদের সন্তান সুস্থ হয়ে উঠবেন এই ভাবনায় যেকোনো ঝুঁকি তারা নিতে পারেন। কিন্তু যখন প্রশ্ন দাঁড়ায় টাকা এবং চিকিৎসা সামগ্রীর, তখন বুকফাটা হাহাকার নিয়ে স্তব্ধ হয়ে যান তারা। চোখের সামনে ধীরে ধীরে সন্তানের মৃত্যু তাকে পাথর বানিয়ে দেয়। গত দুই মাস ধরে প্রতিদিন এমন বাবা-মাকে দেখছে, আমাদের দেশ। জেলা শহরের হাসপাতাল আর ঢাকার হাসপাতালে, মৃত শিশুকে জড়িয়ে বুকে শোকের পাহাড় আর অশ্রুবিহীন শুষ্ক চোখে বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দরিদ্র বাবা-মা। এই মায়েরা সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্রণা অনুভব করলেন, কিন্তু সন্তানের মুখে মা-বাবা ডাক শোনার সুখ পেলেন না। বুকভরা হাহাকার নিয়ে তারা চলে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন রেখে যাচ্ছেন, এই মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? 

গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে গতকাল পর্যন্ত ৪৭৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং প্রতিদিন এই সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশুর, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ শিশু। ৭ হাজার ৩০৫ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে এটাই সত্যিকারের তথ্য নয়। বাস্তব পরিস্থিতি এর চেয়েও ভয়াবহ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারণ দেশের সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা প্রায় ৬৫০টি, যেখানে চিকিৎসার জন্য যাওয়া এবং চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন। আবার বেসরকারি হাসপাতাল ৫৫০০-এর মতো, সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য সবার নেই। ফলে এটা ধারণা করা যায় যে, বিপুল সংখ্যক শিশু হাসপাতালে যাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছে, যার হিসাব বাবা-মা ছাড়া সরকারের কাছে কখনো আসবে না। 

একটা বিষয় খুবই ভাবনার উদ্রেগ করে। হামে শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী কে? এই আলোচনার প্রথমেই বলতে হবে আমাদের পর্যাপ্ত আইসিইউ, পিআইসিইউ, ভেন্টিলেটর, লাইফ সাপোর্ট নেই। কিন্তু এই প্রশ্নটা তো জরুরি যে, কেন একটা শিশুকে এই পর্যায়ে যেতে হচ্ছে যখন তার ভেন্টিলেটর প্রয়োজন? একজন বাবা মাকে যখন সাত-আটটি হাসপাতাল ঘুরে, ঢাকায় আসতে হয়, ততক্ষণে শিশুর জীবনীশক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে শেষ পর্যায়ে। এ রকম সময়ে ভেন্টিলেটর পেলেও বাঁচানো কঠিন। আর না পেলে, মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার থাকে না। বেদনাদায়ক সত্য হলো, দরিদ্র পরিবারগুলো সহজে হাসপাতালে আসতে চায় না। তাদের সহজে কেউ গুরুত্ব দেয় না, চিকিৎসার খরচ, যাওয়া-আসার খরচ আর নিজের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে একেবারে শেষ মুহূর্ত ছাড়া তারা হাসপাতালে আসে। আবার মায়েদের স্বাস্থ্য এতটাই খারাপ থাকে যে, প্রয়োজনীয় বুকের দুধও সন্তান পায় না। ফলে এগুলো বিবেচনায় না নিয়ে, শুধু ভেন্টিলেটর বাড়ালে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং একটি ভেন্টিলেটরের খরচে, শতাধিক শিশুর জন্য অক্সিজেন সাপোর্ট ও কমিউনিটি ভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

টিকা দেওয়ার গাফলতি বা দায়হীনতা, শিশুমৃত্যুকে বাড়িয়ে তুলেছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার ও বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিশে^ টিকাদান কর্মসূচিতে সুনাম অর্জন করেছে। ফলে ‘যার হয় যক্ষ্মা তার নেই রক্ষা’ এ ধরনের ভীতিকর সেøাগান এখন আর শোনা যায় না। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ বিদেশি অনেক আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তা শিশুমৃত্যু কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। এর কৃতিত্ব যারই থাক, সাফল্যের দাবিদার হয়েছে সব সরকার। কিন্তু সাফল্য যেভাবেই আসুক, তার মোহ যে অসতর্ক করে তোলে তার নজিরও আছে। বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্য থাকলেও, নানা সময়ে বিভিন্ন স্থানে হামের প্রাদুর্ভাবের ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে ৯টি শিশু মারা গিয়েছিল। তখন দুর্গম অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সীতাকুণ্ডের সেই হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সতর্ক হয়নি সরকার। ফলে ২০২০ সালের মার্চ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে তখনো সেখানে ৯টি শিশু মারা গিয়েছিল।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ডেটাবেস থেকে দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার হার ছিল প্রতি বছর ৯৭ শতাংশ। এরপরও কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে ৪ হাজার, ২০১৯ সালে প্রায় ৬ হাজার আর বাকি দুই বছরে দুই হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই এই কথাটি ভুলে যাওয়া হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের শিশু বলে উপেক্ষা করা হয়েছে, যার মারাত্মক পরিণতি এবার দেখছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আর একটি বিষয় গভীর উদ্বেগের। টিকার বিরুদ্ধে অবৈজ্ঞানিক প্রচারণাও বেড়েছে। ফলে সরকারের দায়হীনতা এবং এসব নেতিবাচক প্রচারণা সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে।

হামের প্রাদুর্ভাব যে শুধু ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তাই নয়, এটি এখন গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ৫০ হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে। দৃশ্যমান এই সংখ্যা এবং না জানা আরও কতজন আছে, এই আশঙ্কা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক সুস্থতার জন্য শঙ্কা তৈরি করেছে। হামকে কেবল জ¦র এবং শরীরে কিছু লালচে ফুসকুড়ি ওঠার একটি সাধারণ রোগ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই রোগের প্রভাব কেবল চামড়ার ফুসকুড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। হামের ভাইরাসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করার ক্ষমতা, যা আক্রান্ত শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। হামের এই স্নায়বিক প্রভাব নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান দীর্ঘকাল ধরে সতর্ক করে আসছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেছিলেন, হামের সংক্রমণের পর অনেক শিশু তীব্র এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, ‘সাবঅ্যাকিউট স্কেলেরোজিং প্যানেনসেফালাইটিস’ বা এসএসপিই। এটি এমন এক বিরল কিন্তু জটিলব্যাধি, যা হাম হওয়ার ৭ থেকে ১০ বছর পর প্রকাশ পায়। ইতিহাসের বিভিন্ন মহামারী-পরবর্তী পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোতেও যখন টিকাদান কর্মসূচির আগে হামের প্রাদুর্ভাব ছিল, তখন বেঁচে যাওয়া শিশুদের একটি বিশাল অংশ অন্ধত্ব, শ্রবণশক্তি হারানো এবং স্থায়ী মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, যেখানে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছিল না, সেখানে হাম-পরবর্তী ‘নিউরো-ডিজঅ্যাবিলিটি’ বা স্নায়বিক পঙ্গুত্ব কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) ২০১৯-২০ সালের ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের সময় দেখা গেছে, পুষ্টিহীনতা এবং বিশেষায়িত স্নায়বিক সেবার অভাবে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে স্নায়বিক জটিলতার হার ছিল বেশি। একইভাবে ভিয়েতনামে ২০১৪ সালের হামের প্রাদুর্ভাবের পর স্নায়বিক পর্যবেক্ষণ ও পুনর্বাসন না হওয়ায় অনেক শিশু নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতার শিকার হয়েছে। ফলে হাম-পরবর্তী সময়ে একটি সমন্বিত পুনর্বাসনব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হামের কারণে যারা মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত হয়, তাদের মধ্যে অনেক শিশু দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সংকটের মুখে পড়ে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ হয়ে যাওয়া অনেক শিশু পরবর্তী জীবনে কথা বলতে দেরি করা, শেখার অক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া কিংবা মৃগীরোগের মতো স্থায়ী সমস্যায় ভুগতে পারে।

দেশে বর্তমানে যে হাজার হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের অনেকে দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ঝুঁকির আওতায় রয়েছে। ফলে যাদের দায়িত্বহীনতার কারণে শিশুমৃত্যু ও শিশুদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে, তাদের শাস্তির দাবির পাশাপাশি দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন খুব জরুরি। এবার যে শিশুরা আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করেছে তাদের বাবা-মায়েদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র। সন্তান হারানোর বেদনা ও সন্তানের ভবিষ্যৎ চিকিৎসা নিয়ে দুর্ভাবনা তাদের তাড়িত করবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা যেমন করতে হবে, তেমনি আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা এখন সময়ের দাবি। যারা হামের উপসর্গ নিয়ে, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন এবং পরীক্ষা করা হয়েছে যাদের সেসব শিশুদের ডেটাবেজ তৈরি করে আগামী পাঁচ বছর তাদের পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন। পঙ্গু, বিকলাঙ্গ এবং মানসিক ভারসাম্যহীন শিশু শুধু পরিবারে যন্ত্রণা বাড়ায় না সমাজেও সংকট তৈরি করে। ফলে আগাম সতর্কতা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা দরকার। এই দায়িত্ব কে নেবে? দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। সন্তানহারা মায়ের যন্ত্রণার ভাগ নেওয়া যায় না। মা-বাবা আজীবন এই বেদনা বহন করবেন। কিন্তু বেঁচে থাকা শিশুগুলোর যন্ত্রণার লাঘব করার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। সামনে বাজেট আসছে, বাজেটে এর প্রতিফলন যেন থাকে।