অনন্য উচ্চতায় চীন-রাশিয়া সম্পর্ক

বৈশ্বিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন ও রাশিয়া। রাজনৈতিক মতাদর্শগত সহাবস্থান এবং তীব্র যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব দুই দেশের এই চরম সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের রেশ না কাটতেই বেইজিং এ রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের আগমনকে- এর সপক্ষে উদাহারণ হিসেবে ধরা যায়। গতকাল বুধবার বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে বৈঠকটি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, নির্ধারিত সময়ের আগেই দুই নেতা আলোচনায় বসেন। শুরুতে দুই নেতা একান্ত বৈঠকে অংশ নেন। এরপর তারা নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিদল নিয়ে একটি বড় পরিসরের বৈঠকে বসেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিং তার সূচনা বক্তব্যে পুতিনকে বলেন, চীন ও রাশিয়ার উচিত একে অপরের উন্নয়ন এবং পুনর্জাগরণে পারস্পরিক সহযোগিতা করা। শি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং কৌশলগত সহযোগিতা ক্রমাগত গভীর হওয়ার কারণেই আজ সম্পর্ক এই উচ্চতায় পৌঁছেছে। জিনপিংয়ের মতে, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক নতুন গতিতে এগোচ্ছে। বর্তমানের ‘জটিল ও অস্থির’ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে শি বলেন, ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বশক্তি হিসেবে চীন ও রাশিয়ার উচিত একটি ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করা।’

রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন তার বক্তব্যে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক ‘অভূতপূর্ব উচ্চতায়’ পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংকটের মধ্যেও রাশিয়া চীনের জন্য একটি ‘নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী’ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। পুতিন আরও জানান, গত ২৫ বছরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ৩০ গুণেরও বেশি বেড়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিন শি জিনপিংকে ‘প্রিয় বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন। দুই নেতার সাক্ষাতের গুরুত্ব বোঝাতে পুতিন একটি চীনা প্রবাদ ব্যবহার করেন ‘এক দিন দেখা না হলে মনে হয়, তিনটি শরৎ পার হয়ে গেছে’। সাধারণত কোনো বিশেষ ঘটনার জন্য দীর্ঘ ও ব্যাকুল প্রতীক্ষা বোঝাতে এই প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়।

পুতিন আগামী বছর শি জিনপিংকে রাশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং দাবি করেছেন, বেইজিং ও মস্কোর মধ্যকার এই মজবুত সম্পর্ক বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পুতিনের দ্বিতীয় সরাসরি বৈঠক। দুই নেতার এই বৈঠকের পাশাপাশি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র মধ্যেও আলাদাভাবে বৈঠক হয়েছে।

দুই শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ২০টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে আরও ২০টি চুক্তি স্বাক্ষর করা হতে পারে। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এই চুক্তি স্বাক্ষর ও পুতিন-সি বৈঠকের পর দেওয়া যৌথ বিবৃতি ট্রাম্পের সফরের তুলনায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ, ট্রাম্পের বেইজিং সফরে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি এবং কোনো যৌথ বিবৃতিও আসেনি। বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে রাশিয়া-চীন বলেছে, ঔপনিবেশিক মানসিকতা নিয়ে কিছু দেশের বৈশ্বিক বিষয় নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তবে বিশ্ব আবারও ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের রুশ ভাষায় প্রকাশিত ঘোষণায় বলা হয়, বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্বশান্তি ও উন্নয়নের অ্যাজেন্ডা নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভক্তি এবং জঙ্গলের আইনে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পরপরই পুতিনের এই আগমনকে বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই বিশ্বনেতার এই সফরের ধরন, আতিথেয়তা এবং ফল নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন পৌঁছান ভøাদিমির পুতিন। তার এই সফরের মূল লক্ষ্য, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে আলোচনা করা। যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্বব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার প্রেক্ষাপটে এই সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।