উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাত সহসাই অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। টানা দুই সপ্তাহ ধারাবাহিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা স্থগিত করলেও, সপ্তাহ না ঘুরতে দুপক্ষ পুনরায় সংঘাতে জড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে ৩টি জাহাজে হামলা চালায় ইরান। জবাবে ইরানের বিভিন্ন স্থানে শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তুতে এ হামলা চালানো হয়। এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানিয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি ইরান ও তার সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর তৈরি করা হুমকি কমাতেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কেশম দ্বীপে ৩ শিশু নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
আলজাজিরা জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, কেশম দ্বীপে তিনটি বিস্ফোরণ হয়েছে। বুশেহর প্রদেশেও বিস্ফোরণ হয়েছে। এ ছাড়া খুজেস্তান প্রদেশের আবাদান শহরে, হোরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাসে, আবু মুসা, সিরিক, কিশ শহরেও একাধিক হামলার খবর জানিয়েছে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। সেন্টকম জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজারেরও বেশি সেনা মোতায়েন রয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
এর আগে জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা তাদের (ইরান) ওপর খুব কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি। কারণ, এখন আমাদের আঘাত হানার পালা।’ পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরানও। আইআরজিসি জানায়, ‘শিশুহত্যায় জড়িত থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে’ তারা জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটি এবং একটি কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়েছে। এছাড়া গত বুধবার ইরানের ড্রোন হামলায় মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় দামিয়েত্তা বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি গ্যাস সংরক্ষণকারী ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও, পরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি ইরানি সূত্র নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছে মিসরে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ওই গ্যাস ট্যাংকারে ড্রোন হামলার নেপথ্যে তেহরানই ছিল। চলমান যুদ্ধে মিসরে এটিই প্রথম সরাসরি আঘাত। ওই দুই ইরানি সূত্র জানিয়েছেন, ড্রোন হামলা থেকে ওই বিস্ফোরণ হয়েছে। এই হামলার পেছনে একটি বার্তা রয়েছে ইরান যদি এই সংঘাতের তীব্রতা ও পরিসর আরও বাড়াতে চায়, তাহলে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহ আরও মারাত্মকভাবে বিঘিœত করা সম্ভব। তবে এই হামলা সরাসরি ইরান চালিয়েছে, নাকি ওই অঞ্চলে সক্রিয় তাদের সমর্থিত কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী চালিয়েছে সে বিষয়ে সূত্র দুটি কিছু বলেননি। এমনকি কোথা থেকে এই হামলা চালানো হয়েছে, সেটিও তারা স্পষ্ট করেননি। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বুধবার তারা ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। হরমুজ প্রণালি থেকে অর্থ উপার্জনের যে চেষ্টা ইরান চালাচ্ছে, সেটি রুখতেই ১০টি প্রতিষ্ঠান ও আরও আটটি ট্যাংকারের ওপর এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টির অবস্থানই চীনে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) মূলত দুটি সংস্থাকে টার্গেট করেছে। সেগুলো হলো পার্সিয়ান গলফ মেরিন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এবং হরমুজসেফ মেরিন সার্ভিসেস অথরিটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের ওপর চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করতে এবং নিজের জনপ্রিয়তায় ধস নামানো এই চরম অপ্রিয় যুদ্ধের ইতি টানতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন অর্থনৈতিক চাপ আর সামরিক আঘাত দুটোকেই একসূত্রে বেঁধে এগোতে চাইছে; এই নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই কৌশলেরই অংশ।
