কামরাঙা ফুল

‘আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে

বসে থাকি; কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো

গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে আসিয়াছে শান-অনুগত

বাংলার নীল সন্ধ্যাা-কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে;’

            জীবনানন্দ দাশ

ওখানে গঙ্গাসাগর নেই, আছে ঝিল-হাতিরঝিল। এক সময় পিলখানা থেকে হাতিরপুল হয়ে হাতির পাল সেই ঝিলে যেত গোসল করতে। এখন হাতি নেই, কিন্তু ঝিলটা আছে। চারপাশে লাগানো গাছগুলো ঝিলের জলে ছায়া ফেলে রোজ। জলের ওপর দিয়ে দৌড়ে বেড়ায় মাতাল হাওয়া। বসন্তের শেষে এক সকালে সে ঝিলের পাড়ে হেঁটে হেঁটে গাছপালা দেখছিলাম। মাঝামাঝি জায়গায় একটা সেতু পার হতেই ছোট একটা কামরাঙা গাছ চোখে পড়ল। আহা, ক্ষীণ তন্বী সে গাছটার বাহুর মতো সরু ডালপালা অলংকৃত হয়ে আছে ফুলে ফুলে। যেন ডালে ডালে মেখে আছে লাল মেঘের টুকরো। নাকফুলের মতো ছোট ছোট বেগুনি-লাল কামরাঙা ফুলগুলোর রূপ এভাবে এত কাছ থেকে কখনো দেখা হয়নি। গ্রামের বাড়িতে ছোটবেলায় কত না কামরাঙাগাছ দেখেছি। পাকা টসটসে হলদে শিরতোলা শিরাল কামরাঙার অমøমধুর রসে কেটে যেত রৌদ্রদগ্ধ দুপুরবেলা আহা কি মধুর ছিল সে শৈশবকাল!

কামরাঙার নাম পাওয়া যায় রামায়ণেও। পঞ্চবটী বনে কামরাঙা গাছ ছিল কি না জানা নেই। তবে রামের বনবাসকালে লঙ্কার রাজা রাবণের বোন শূর্পনখার রূপের বর্ণনা করতে রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি লিখেছিলেন ‘রঙ্গ করে কর্ম করার রূপক হলো কামরাঙায়, বাল্মীকি তার রূপ দিয়েছেন শূর্পনখার রূপখানায়।’ তবে গাছটা যে আমাদের এ অঞ্চলের তা এ কালের গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন। বলেছেন, কামরাঙার আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় সাধারণত এ গাছ দেখা যায়।

ইংরেজিতে এ ফলকে বলা হয় স্টার ফ্রুট। ফলকে আড়াআড়িভাবে কাটলে তার পাঁচটি শির তারার মতো দেখায়, এজন্য এরূপ নাম। বৈজ্ঞানিক নাম আবৎৎযড়ধ পধৎধসনড়ষধ ও গোত্র অক্সালিডেসী। মাঝারি থেকে বড় আকারের বৃক্ষ, চিরসবুজ। ফুল ছোট হলেও তার রঙ ও রূপ আকর্ষণীয়। ছোট্ট ঘণ্টার মতো গোলাপি-বেগুনি ফুলগুলো যখন থোকায় থোকায় ফোটে তখন গাছের পাশটা আলো হয়ে যায়। ফুলের উজ্জ্বল রঙ মধুপায়ী মৌমাছিদের টেনে আনে। মৌমাছিরা ফুলের মধু খেয়ে চলে যায় আর ফুলকে ফলবতী করে রেখে যায়।

ফুলের আকার প্রায় এক সেন্টিমিটার। অথচ সেই ছোট্ট ফুলের কি বৈভব! সামান্য লাল আভাযুক্ত পাঁচটা পাপড়ির সে রূপ যে খুব কাছ থেকে না দেখেছে সে আসলে বুঝবে না এ বনফুলের ঐশ^র্য। পাতা ডিম্বাকার ও অগ্রভাগ ক্রমশ সরু। রক্তাভ কচিপাতাগুলো বের হওয়ার পর থেকেই প্রতি মুহূর্তে রঙ বদলাতে থাকে, শেষে সবুজ হয়ে যায়। ফল ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, কাঁচা ফল উজ্জ্বল সবুজ থাকলেও পাকলে হয়ে যায় হলদেটে ও রসাল, সুগন্ধযুক্ত। কাঁচাফল টক, পাকলে হয় টকমিষ্টি। ফল পুষ্টিকর ও ভক্ষণীয়।

খাওয়ার পাশাপাশি এশিয়ার অনেক দেশে এ ফল জলবসন্ত, অন্ত্রের পরজীবী, মাথাব্যথা ইত্যাদি ও রোগের লোক চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। শিবকালী ভট্টাচার্যের চিরঞ্জীব বনৌষধি বইয়ের চতুর্থ খণ্ডে কামরাঙা সম্পর্কে বলা হয়েছে, কাঁচা কামরাঙা টক হলেও তা দেহের তাপ বাড়ায় ও বুকের পীড়াদায়ক। কিন্তু পাকা ফল বলকারক ও পিত্তবর্ধক। তিনি লিখেছেন, অত্যধিক পাতলা পায়খানা হলে বারে বারে খুব মিষ্টি পাকা কামরাঙার রস এক চা-চামচ করে কয়েকবার খাওয়ালে দাস্ত হওয়া বন্ধ হয়। ফলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে বলে জানা গেছে। কামারাঙা ফল সাধারণত লিভার বা যকৃতের জন্য ক্ষতিকর না, কিন্তু কিডনি রোগীদের জন্য বিষাক্ত। কামরাঙার ফুল ফোটে বসন্তের শেষ থেকে গ্রীষ্মকালে। ফল পাকতে শুরু করে নভেম্বর থেকে। কাপড়ের কোথাও লোহার মরিচা দাগ লেগে গেলে সে জায়গার ওপর কামরাঙা কেটে ঘঁষলে সে দাগ উঠে যায়।

গাছ দেখতে দেখতে ক্লান্ত শরীর। আকাশের সূর্য ঢালছে সকালের কামরাঙা রোদ। নির্জন পথে পড়ে আছে কাঁঠাল আর মেহগনির গাছের ছায়া, পথের ধারে জন্মানো ত্রিধারা আগাছার ঝোপ। ফিরতে চাই। ভুল পথে তবু হাঁটি গাছের নেশায়, হাতছানি দিয়ে ডাকে কামের রঙে রাঙা ওই বনফুল। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সোনার মুকুট কবিতার মতো তখন নিজেকে শুধাই ‘একটুখানি ভুল পথ, অনায়াসে ফিরে যাওয়া যেত/আকাশে বিদ্যুৎদীপ্ত, বুক কাঁপানো হাতছানি/এই কামরাঙা গাছ-নীল-রঙা ফুল, সবই ভুল/হে কিশোর তবু তাই হলো এত প্রিয়?’

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ