হাটে সক্রিয় জাল নোট চক্র

ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদ ঘিরে দেশজুড়ে জাল টাকার নোট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পশুর হাটকে কেন্দ্র করে ব্যাপক লেনদেনের সুযোগে কোটি কোটি টাকার জাল নোট ছড়িয়ে দিতে সক্রিয় হয়েছে প্রতারকচক্র। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার উত্তরা ও গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে ৩৪ লাখ টাকার জাল নোট ও বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই অপতৎপরতা মোকাবিলায় পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

ঈদুল আজহা মানেই বাড়তি খরচ, বাড়তি লেনদেন। পশু কেনাবেচা, নতুন পোশাক কেনা, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের মধ্যে উপহার বিনিময় সব মিলিয়ে নগদ টাকার লেনদেন বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চায় জাল টাকার সিন্ডিকেটগুলো। এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষেও এই চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ জাল নোটসহ তিনজনকে আটক করার পাশাপাশি জাল টাকা তৈরির তিনটি বিশেষ মেশিন এবং অন্যান্য সরঞ্জামও উদ্ধার করেছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের ডিসি এন এম নাসিরুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রথমে উত্তরায় জাল টাকা বিক্রির সময় এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাল টাকা তৈরির একটি কারখানা পাওয়া যায়। তিনি আরও জানান, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে জাল নোট বানিয়ে বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করছিল। তাদের বিশেষ টার্গেট ছিল কোরবানির পশুর হাটসহ সারা দেশের মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলো।

শুধু ডিবি নয়, র‌্যাবও একাধিক অভিযান চালিয়ে জাল টাকা তৈরির সঙ্গে জড়িতদের আটক করেছে। রাজধানীর মতিঝিলে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-৩ দুই যুবককে আটকের পাশাপাশি জাল নোট তৈরির সরঞ্জাম, কম্পিউটার, স্ক্যানার, কালার প্রিন্টার ও ২০ হাজার টাকার জাল নোট উদ্ধার করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে জানান, অন্যান্য বছরের মতো এবারও বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে জাল টাকা ব্যবহার প্রতিরোধে সচেষ্ট। রাজধানীতে এ বছর ২৪টি হাটে ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট খোলা এবং লেনদেনের ব্যবস্থা থাকবে। এতে লেনদেনের ক্ষেত্রে জাল টাকা ব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া টাকা পরিবহনের মতো ঝামেলা ও ঝুঁকি এড়ানো যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে এ বিষয়ে সক্রিয় হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে ব্যাংকের বুথ বসিয়ে বিনামূল্যে জাল নোট শনাক্তের সেবা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু অভিযান নয়, সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। কারণ একটু অসতর্ক হলেই জাল নোট হাতবদল হয়ে যেতে পারে।

এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন বসানো হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবও কন্টোল রুম স্থাপন, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা তৎপরতা ও সিসি ক্যামেরায় নজরদারির করবে। বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের।

জাল টাকা ছড়িয়ে পড়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক কাজ করছে। লেনদেনের ক্ষেত্রে অনেকেই নতুন টাকা নিতে চান না। সদরঘাট এলাকায় বাইকের রাইড শেয়ার কাজে নিয়োজিত পারভেজ আহমেদ বলেন, নতুন টাকার মান এখনো বোঝা যাচ্ছে না। নতুন নোট আর জাল নোট চেনার উপায় না জানায় দুইবার প্রতারিত হয়েছি। তাই পুরনো টাকা দিলে খুশি হই।

রাজধানীর মগবাজার এলাকার একজন ডাব বিক্রেতা কামাল জানান, ১৪০ টাকার ডাব বিক্রি করলে ক্রেতা ১০০ টাকার একটি এবং ২০ টাকার দুটি নোট দেন। লেনদেন করতে গিয়ে ধরা পড়ে ১০০ টাকার নোটটি জাল। এখন কেউ নতুন টাকা দিলে নিতে ভয় লাগে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে জাল টাকা তৈরি করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। সাধারণ প্রিন্টার, উন্নত গ্রাফিক্স সফটওয়্যার ও অনলাইন টিউটোরিয়াল ব্যবহার করে চক্রগুলো খুব সহজেই নিখুঁত জাল নোট তৈরি করছে। আগে এক লাখ টাকার জাল নোট তৈরি করতে কয়েক হাজার টাকা খরচ হতো, এখন তা অর্ধেকেরও কম খরচে সম্ভব হচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, জাল টাকার বিস্তার শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। বাজারে জাল নোট ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হন, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন এবং মুদ্রাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। আমাদের সবাইকে জাল টাকা চেনার উপায়গুলো সাধারণ মানুষকে জানতে হবে। নোট হাতে নেওয়ার সময় জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা, রঙ পরিবর্তনশীল কালি ও কাগজের গঠন পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সন্দেহজনক নোট পেলে তা গোপন না রেখে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো প্রয়োজন।

জাল টাকা চেনার উপায়

জাল নোট চেনার কিছু উপায় রয়েছে। এর একটি হচ্ছে জলছাপ। আসল নোটে আলোর বিপরীতে বাঘের মাথা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রামের স্পষ্ট জলছাপ দেখা যায়। আরেকটি হচ্ছে নিরাপত্তা সুতা। সব নোটেই নিরাপত্তা সুতা থাকে। ১০০০ টাকার নোটে সুতা নাড়ালে রঙ সোনালি থেকে সবুজে পরিবর্তিত হয়। অসমতল ছাপাও একটি উপায়। আসল টাকা বিশেষ কালিতে ছাপা হয়, যা হাতে খসখসে অনুভূত হয়। অতিবেগুনি বা আল্ট্রাভায়োলেট লাইট দিয়েও চেনা যায়। এই লাইটের নিচে আসল নোটের নির্দিষ্ট জায়গা জ্বলজ্বল করে ওঠে।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি যেমন মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিং এখন নিরাপদ। এতে জাল টাকার ঝুঁকি নেই।