বিএমইউর ৮১ কোটি টাকা চেয়ারম্যানদের অ্যাকাউন্টে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়-বিএমইউ) মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ব্যাংক হিসাবে ১৫ কোটি টাকার বেশি জমা আছে। কিন্তু বিভাগীয় তহবিলে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা রেখে অতিরিক্ত সব টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে স্থানান্তর করতে হবে। সেটি করা হয়নি। শুধু মাইক্রোবায়োলজি বিভাগই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০টি বিভাগ ও ইউনিটের তহবিলে প্রায় ৮১ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এসব টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে থাকার কথা থাকলেও সেখানে যাচ্ছে না। ২০২৪ সালের ৪ জুলাই কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) অফিস থেকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পূর্ব নাম ছিল ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমআর)। এটি ১৯৬৫ সালে রাজধানীর শাহবাগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালে আইপিজিএমআরকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় রাখা হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সর্বশেষ ২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সংগ্রহের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে স্থানান্তর করা হয়। এরপর আর কোনো অর্থ বিভাগ বা ইউনিট থেকে কেন্দ্রীয় তহবিলে স্থানান্তর করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ও ইউনিটপ্রধানরা প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের তহবিলে সেটা রেখে দেন। ফলে এসব অর্থ অলস পড়ে আছে।

কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফিসের ২০২৩ সালের নিরীক্ষায় বিষয়টি উঠে আসে। এরপর ২০২৪ সালের ৪ জুলাই বিষয়টি সিদ্ধান্তের জন্য জাতীয় সংসদে পাঠানো হয়। ওই প্রতিবেদন সংসদে পৌঁছানোর কয়েক দিন আগেই দেশে কোটা আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলন পরবর্তী সময় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়ে যায়। এ কারণে জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি।

বর্তমান সংসদ থেকে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে তা নিশ্চিত হতে চিফ হুইফ নুরুল ইসলাম মনির মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হয়। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জবাব পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আক্তার জানান, এখন বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় গজ, ব্যান্ডেজ ও ছোট ছোট যন্ত্রপাতি সেগুলো বিভাগ থেকে কেনা হয়। এ কারণে বিভাগীয় অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা স্থিতি রেখে বাকি টাকা জমা দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছে। বেশিরভাগ সময় হয়তো একটু দেরি হয়, কিন্তু টাকা জমা দেওয়া হয়। আবার বড় বড় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সময় যেসব বিভাগের ভালো আয় আছে, সেটির মূল্য বিভাগীয় তহবিল থেকে দিতে বলা হয়। এরপর কোনো স্থিতি থাকলে ১০ লাখ রেখে বাকিটা দিয়ে দেয়। এগুলো নিয়ে বেশি ঝামেলা হয় না।

তিনি আরও বলেন, আমরা ২০২৪ সালের আগস্টের পর দায়িত্ব নিয়েছি। আমাদের সময়ে সব কিছুতেই সমন্বয় করে কাজ করছি। এগুলো এখন একটা নিয়মের মধ্যে চলে এসেছে। আমরা জানি যেগুলো সিরিয়াস অডিট আপত্তি হয়, সেগুলোই সংসদ যায়। অডিট আপত্তিগুলো এখন কী উপায়ে নিষ্পত্তি করা সহজ হবে, সেটি দেখতে হবে।  

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিএজি অফিস থেকে অডিট করে সংসদে পাঠানো হয়ে থাকলে সেটি সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করে করা হয়েছে। এই নিরীক্ষার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, কেন নেয়নি তার জবাবদিহিতার বিষয় আছে। এখানে জনগণের ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আটকে রাখা হয়েছে। এখানে দুর্নীতি হয়েছে এবং তারা এর সুরক্ষা পেয়েছে। এটার জন্য যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে মতামত জানতে গত ১৬ মে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফএম সিদ্দিকীর মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জাতীয় সংসদে পাঠানো এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ অর্থবছরের ক্যাশবই ও ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০টি ইউনিটে কালেকশন হয়েছে ৮১ কোটি ৮৮ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৭ টাকা। এসব অর্থের মধ্যে প্রতিটি ইউনিট তিন লাখ করে ৯০ লাখ টাকা নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন। অবশিষ্ট ৮০ কোটি ৯৮ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৭ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দিতে হবে। কিন্তু এসব টাকা কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দেওয়া হয়নি, যা কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা হলে সমপরিমাণ সরকারি অর্থের চাহিদা কম লাগত। এতে সরকারের বাজেটেও ঘাটতি হ্রাস পেত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবিধানমালা ২০১৭-এর ২৮(৫) ধারা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ইউনিটসমূহের কালেকশন ছাড়া অন্য সব কালেকশন করা অর্থ মাস শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে স্থানান্তর করতে হবে। তবে বিভাগীয় তহবিলে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জমা রাখা যাবে। এ টাকা থেকে অফিস ও অন্যান্য খরচের জন্য একটি ব্যয়ের হিসাব থাকবে। নিরীক্ষিত প্রতিষ্ঠান থেকে অডিট আপত্তির নিষ্পত্তির জন্য যে জবাব দিয়েছে, সেটি সন্তোষজনক নয়। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবিধানমালা ২০১৭-এর ২৮(৫) অনুসরণ না করায় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় তহবিল  ৮০ কোটি ৯৮ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৭ টাকা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এটি আর্থিক বিধি ও হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি সংক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবিধানমালা ২০১৭-এর ২৮(৫) ধারা লঙ্ঘন। বিষয়টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করে ২০২২ সালের ২৯ জুন প্রতিষ্ঠানে এআইআর পাঠানো হয়। এরপর একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর তাগিদপত্র পাঠানো হয়। সর্বশেষ একই বছরের ১৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে আধাসরকারি পত্র দেওয়া হলেও বিষয়টি নিষ্পত্তিমূলক কোনো জবাব দিতে পারেননি। এরপরই ২০২৪ সালের ৪ জুলাই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতীয় সংসদে পাঠানো হয়।

অতিরিক্ত টাকা যেসব বিভাগে রয়েছে : প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, কার্ডিওলজি বিভাগের ব্যাংক হিসাবে দুই কোটি ৯৯ লাখ ২৮ হাজার ৩১৬ টাকা, ক্যাথল্যাব ফান্ডে এক কোটি ৩৩ লাখ ৯৪ হাজার ২২৮ টাকা, শিশু হেমাটোলজি বিভাগে ৯৩  লাখ ৮৮ হাজার ১৩৭ টাকা, পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি স্পেশাল ল্যাবরেটরির হিসাবে ৭৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯২ টাকা, হেমাটোলজি বিভাগে ৭৩ লাখ ৫০ হাজার ৫৯২ টাকা, ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট অব ইউরোলজি ১৩ লাখ ২০ হাজার ৪৪৩ টাকা, ইউরো- ফ্লোমেট্রি ডিপার্টমেন্ট অব ইউরোলজিতে ১২ লাখ ৬১ হাজার ৬৩৮ টাকা, পেডিয়াট্রিক সার্জারিতে ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯৩৫ টাকা, নিউসার্জারিতে এক কোটি এক লাখ ১৬ হাজার ৬৯৭ টাকা, পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনে ১৩ লাখ ৭৪ হাজার, পেডিয়াট্রিক ক্যাথল্যাব ফান্ডে ৫৫ লাখ চার হাজার ৮৪৯ টাকা, ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনে এক কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ৭৪৮ টাকা, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিতে ৫৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৬৯ টাকা, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে চার কোটি ৪৫ লাখ ৫৫ হাজার ১১৮ টাকা, অ্যানেসথেশিয়া বিভাগে এক কোটি আট লাখ ৭৮ হাজার ৮১ টাকা,  অ্যানেসথেশিয়া (আইসিইউ) বিভাগে চার কোটি ৮০ লাখ ৩২ হাজার ৩১৭ টাকা, রিপ্রোডাকটিভ এন্ডোক্রাইমোনলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটিতে ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ টাকা, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিতে দুই কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার ২৪৪ টাকা, কার্ডিয়াক সার্জারিতে ৭৩ লাখ ৪২ হাজার ৮৫৭ টাকা, মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইমিনোলজিতে ১৫ কোটি দুই লাখ ২৪ হাজার ৩০২ টাকা, ডার্মালোজি-ভেনারোলজি দুই কোটি ৩০ লাখ ১৩ হাজার ৮২৭ টাকা, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে (এমআইআর ফান্ড) ছয় কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার ৭৬২ টাকা, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে ১০ কোটি ৮৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৬৩ টাকা,  ফেটো মেটারনাল মেডিসিন ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৩৩৮ টাকা, ইএনটি ইনভেস্টিগেশন এক কোটি ৭৩ লাখ এক হাজার ১৩৩ টাকা, ভাইরোলজি বিভাগে তিন কোটি ৯০ লাখ ৭৪৪ টাকা, নেফ্রোলজিতে এক কোটি ১৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৪ টাকা, অটোলারিনোলজিতে ৬৮ লাখ ৬১ হাজার ৩৭২ টাকা, বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে ১৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৬ হাজার ৮৯৭ টাকা এবং নিউনোটলজি বিভাগে ১১ লাখ ৪০ হাজার ৬০৪ টাকা রয়েছে। এ স্থিতি ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে বর্তমান সময়ের স্থিতির হিসাব পাওয়া যায়নি।