গরিবের কপালে চিন্তার ভাঁজ

জাতীয় বাজেট ঘোষণা মানেই বিশাল অঙ্কের টাকা; যেখানে থাকে সরকারের আয়, ব্যয়সহ বছরব্যাপী উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের চিত্র। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকারের পরিকল্পনায় থাকা রাজস্ব আদায়, ঋণ গ্রহণ, শুল্ক, মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) মতো বিষয় ব্যবসায়ী মহলে গুরুত্ব বহন করলেও সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে এসবের তেমন একটা গুরুত্ব নেই। যদিও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি কিংবা প্রবৃদ্ধির হিসাব মেলাতে বড় বড় সভা সেমিনারে বসেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষ এসব বিষয় না বুঝলেও এটা ঠিক বুঝেন যে, বাজেট হলেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, যা বছরজুড়ে কারণে-অকারণে অব্যাহত থাকে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে বাজেটের সাফল্য নির্ভর করে দিনের শুরুতে স্বাভাবিকভাবে রান্নার হাঁড়িটি চুলায় উঠল কিনা, তার ওপর।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃতে গত ১৩ মে নতুন বাজেটের সার্বিক দিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়। আসন্ন ঈদুল আজহার পর ১১ জুন জাতীয় সংসদে এ বাজেট উপস্থাপন করা হবে।

সাধারণ মানুষের অভিযোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদেশে যুদ্ধের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নতুন অর্থবছরে সরকার নিত্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, কম আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা বাড়াবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। কারণ, বছরের প্রতিদিন তাদের হিসাব করতে হয় চাল, ডাল, তেল, বাসা ভাড়া, বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচ, আর ওষুধের দাম নিয়ে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে আগামী বাজেটে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য বিশেষ উদ্যোগ থাকা দরকার। তবে তা কার্যকর করতে হলে সরকারকে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া সহায়তার অর্থও মানুষের প্রকৃত উপকারে আসবে না। জানা গেছে, সরকার এরই মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করেছে। এবারের বাজেটে সরকার একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চিন্তা করছে, অন্যদিকে দৈনন্দিন ব্যবহৃত পণ্যে কর ও ভ্যাট বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মুদি দোকানকে ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে, যা সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগে পড়বে।

রাজধানীর কয়েকটি এলাকার নিম্ন আয়ের পরিবারের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বেশিরভাগ পরিবার সাপ্তাহিক বা দৈনিক আয়-ব্যয়ের হিসাব করে থাকে। মাসের শুরুতে ঘরভাড়া, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, বিদ্যুৎ বিল আর ঋণের কিস্তি মিলিয়ে প্রয়োজনের তালিকা তৈরি করে। কোনো সপ্তাহে আয় কম হলে মাছ-মাংস বাদ পড়ে, কমে যায় পুষ্টিকর খাবার। অনেক পরিবার আবার মাসের শেষ সপ্তাহে ধার, বাকির দোকান কিংবা এনজিও ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

রাজধানীর মধুবাগ এলাকায় থাকেন ফয়সাল মিয়া। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পিয়নের কাজ করেন তিনি। স্ত্রী ও চার মেয়েসহ ছয় সদস্যের সংসার তার। সরকারের বাজেট সম্পর্কে তেমন ধারণা না থাকলেও সংসার চালাতে প্রতি মাসে আলাদা হিসাব কষতে হয় তাকে। ফয়সাল মিয়া জানান, মাসিক বেতন থেকে ৫ হাজার টাকা চলে যায় ঘর ভাড়ায়। তিন মেয়ের পড়া লেখার খরচ দিতে হয় আরও ৩ হাজার টাকা। চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেই মাস শেষে হাতে আর কিছু থাকে না। তবে পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বিপদে পড়তে হয় তাকে। তখন চিকিৎসার খরচ মেটাতে ধারদেনা বা পাড়া-মহল্লার সমিতি বা এনজিও থেকে ঋণ করতে হয়।

সংসারের বাজেট নিয়ে দেশ রূপান্তরকে ফয়সাল বলেন, বেতন যা পাই হিসাব করেই খরচ করি। এরপরও মাস শেষে হাতে কিছু থাকে না। এক মাস আগে ছোট মেয়েটার ডায়রিয়া হয়েছিল। প্রথমে মগবাজার কমিউনিটি ক্লিনিক, পরে আরেক হাসপাতালে নিয়েছি। দুই জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অফিস থেকে আগাম বেতন নিয়েছি, বাকিটা ধার করেছি। এখন প্রতি মাসে কষ্ট করে সেই টাকা শোধ করছি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় এসেছে, একটি পরিবারের মোট মাসিক ব্যয়ের প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে চলে যায়। আর দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ (মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ) মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা পূরণ হয় না।

বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে এই নিম্ন আয়ের মানুষগুলো। আয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি চিকিৎসা ব্যয়ে চলে গেলে বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ সামলাতে আরও বেশি হিমশিম খেতে হবে তাদের।

রাজধানীর সবুজবাগের রঙমিস্ত্রি কালাম। স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে তার সংসার। বাজেট নিয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজেট কী, সেটা খুব বেশি বুঝি না। তবে টিভিতে খবর দেখে বুঝি, বাজেট হলেই কিছু জিনিসের দাম বাড়ে।’

সংসারের খরচ নিয়ে কোনো মাসিক পরিকল্পনা আছে কি না এমন প্রশ্নে কালাম বলেন, ‘না, ওই রকম কোনো পরিকল্পনা থাকে না। হাতে টাকা বেশি এলে চাল ডাল কিছু কিনে রাখি। বড় কোনো কাজ পেলে তখন পরিবার নিয়ে একটু ভালো-মন্দ খাওয়া হয়। আর কাজ কম থাকলে কোনো রকমে সংসার চালাই।

বাজেট নিয়ে প্রত্যাশা জানতে চাইলে কালাম বলেন, ‘বাজেট যেমনই হোক, জিনিসপত্রের দাম যেন কম থাকে। দেশের বাজেট বাড়ল না কমল (বাজেটের আকার), এসব আমরা বুঝি না। বাজারে দাম বাড়লে আমরা চাপে পড়ি। সংসার চালানো অনেক কঠিন হয়ে যায় তখন।’

এদিকে নতুন অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ঋণ সহায়তা ও বিদেশি অর্থায়ন থেকে আসবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এডিপিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে ১ হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্প সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ৮০টি এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

খাতভিত্তিক বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলি খাতে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

রাজস্ব ঘাটতি ও বাড়তে থাকা ঋণের চাপের মধ্যেই আগামী অর্থবছরের বড় বাজেট পরিকল্পনাকে উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে আত্মবিশ্বাসী অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে এমন প্রশ্নে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, এতদিন যেসব জায়গা রাজস্ব আদায়ের বাইরে ছিল, সেগুলোকে এবার আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে, আমরা সেটাই করছি। রাজস্ব আদায়ের হার আমাদের দেশে বিশ্বের তুলনায় একেবারেই নিম্ন পর্যায়ে। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে যে অর্থায়ন প্রয়োজন, সেটি আমাদের অবশ্যই করতে হবে। এ জন্য আমরা এনবিআরের একটি রিফর্ম প্রোগ্রামে যাচ্ছি।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজেট এলে সাধারণ মানুষ ভয় পায়, এটা বাংলাদেশের বাস্তবতা। আমিও ভয় পাই। বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে উচ্চবিত্তের কাছ থেকে যথাযথ রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা। কিন্তু বাংলাদেশে এমন কোনো বাজেট আমার চোখে পড়েনি। সবসময় দেখা যায়, নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর নতুন করে করারোপ করা হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। একটা বাজেট দেখাতে পারবেন না, যে বাজেটের পর জিনিসপত্রের দাম কমেছে। ফলে, জনগণের তো বাজেটকে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। সরকার জনকল্যাণের কথা বলে উচ্চবিলাসী বাজেট দিচ্ছে। আগামী বাজেটও উচ্চবিলাসী হতে যাচ্ছে। সরকার মৌলিক খাতে বরাদ্দের (কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য) নামে অনিয়ম ও লুটপাটের আয়োজন করলে উন্নয়ন কীভাবে হবে। এসব টাকা (বরাদ্দ) তলাবিহীন ঝুঁড়িতে ঢালা হবে। দেখেন, আইএমএফ ঋণের টাকা দিতে অনিহা প্রকাশ করছে। এর কারণ, তারা বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখেছে, দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো না। আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা যদি এখানে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়, তাহলে তো স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও ভয়ে থাকবেন। আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? যতটুকু বুঝি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থনীতির রোগ চিহ্নিত করেছে। কিন্তু নতুন সরকার প্রতিকারের ব্যবস্থা না নিয়ে গতানুগতিক ওষুধ বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে বাজেটের আকার ও বরাদ্দের আকার যত বড়ই হোক, এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে, সমাধানের নামে সরকারি কমিটর বরাদ্দও বাড়তে থাকবে। এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষক সংকট রয়েছে। সেটি সমাধান না করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বড় বড় ভবন তৈরি করা হচ্ছে। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে একচেটিয়া বাজারব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় দিনের পর দিন বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সংকটের মধ্যে রয়েছে শিল্প খাত। ফলে আগামী বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিকর কিছু আসবে বলে মনে হয় না।