ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা। মাত্র শুরু হয়েছে পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ক্লাস। সাদা স্কুল ড্রেস পরে ক্লাসরুমে বসে আছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। হঠাৎ সেখানে হাজির হন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। মেয়ের বন্ধুদের বুকে জড়িয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। রামিসার সহপাঠীর মুখে পরম আদর মাখা হাতখানি বুলাচ্ছিলেন আর বলছিলেন ‘তোরা আমার রামিসা, বাবা; তোরাই আমার রামিসা।’ শিশুবাচ্চার মতো এভাবে হাউমাউ করে অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছিলেন আবদুল হান্নান। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যে উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে রামিসার সহপাঠীরাও। তাদের সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা যেন কারও জানা নেই।

নৃশংস এই হত্যাকা-ের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ। হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে পল্লবীতে বিক্ষোভ করেন রামিসার সহপাঠী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও পল্লবী থানা ঘেরাও করেন এলাকাবাসী। মানববন্ধন করেছে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা বিভাগ। সংবাদ সম্মেলন করে বিচার চেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঘাতক সোহেল রানার শাস্তি চেয়েছেন তার বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরাও। ঢাকা ছাড়াও নোয়াখালী, কুমিল্লা, যশোর, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল। গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে বিচার দাবি করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। বিচার চেয়ে সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করেছেন ক্রিকেটার, কণ্ঠশিল্পীসহ অনেকে। কেউ কেউ বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে পোস্ট করেছেন। এ ঘটনায় এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

রামিসার ঘটনা শুধু তার সহপাঠী কিংবা পরিবারকে স্তব্ধ করে দেয়নি, স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো দেশকে। শ্রেণিকক্ষে কথা হয় রামিসার সহপাঠী মাইসার সঙ্গে। তখনও তার চোখের জল ঝরে পড়ছে স্কুল ড্রেসে। কোমলমতি এ শিশু কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে আমার খুব খারাপ লাগছে। ডান পাশে হাত দেখিয়ে বলছে, ও (রামিসা) আমার পাশেই বসত। আমরা একসঙ্গে খেলা করতাম। নাস্তা ভাগ করে খেতাম। এ সময় পাশ থেকে স্কুলটির একজন শিক্ষিকা বলেন, আমরা কেউ ঠিক থাকতে পারছি না। আমাদের প্রত্যেকের বাচ্চা আছে, ছোট বোন আছে। ঘটনার পর ক্লাসের বাচ্চারা খুবই আতঙ্কে আছে। এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।

এর আগে সকালের দিকে রামিসার ছবি সংযুক্ত ব্যানার হাতে পল্লবী সড়কে নামেন নিহতের সহপাঠীরা। হ্যান্ডমাইকে এক শিক্ষক বলছিলেন তুমি কে আমি কে। শিক্ষার্থীরা সেøাগান তুলে রামিসা, রামিসা। উই ওয়ান্ট জাস্টিস, জাস্টিস ফর রামিসা। সেখানে সিনিয়র সহপাঠী সুমাইয়া জানায়, ‘দ্বিতীয় শ্রেণিতে রামিসার রোল নম্বর ১ ছিল। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ায় সহপাঠীদের চাকোলেট খাওয়াতে চেয়েছিল। কিন্তু এর আগেই ওকে চলে যেতে হলো। আমরা এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

প্রায়ই একই সময়ে বিচারের দাবিতে রাজপথে নামেন নানা শ্রেণিপেশার স্থানীয়রা। তারা পল্লবী থানা ঘেরাও করে এবং ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ করে অপরাধীর দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান। খুনির বিচার চেয়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগীয় সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন এমন নির্মম হত্যাকা- কোনো পরিবার কোনো দিন ভুলতে পারবে না। আমরা দ্রুত এ হত্যাকা-ের বিচার দাবি করছি।

দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা রামিসা হত্যার দ্রুত তদন্ত শেষ করে রায় কার্যকরের দাবি জানান। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বিচার চেয়েছে জাতীয় শিশুকিশোর সংগঠন ‘ফুলকুঁড়ি আসর’। এতে অভিভাবক ও কয়েকশ শিশু-কিশোর অংশ নেয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন করে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদের সহ-সভাপতি মাসুদ মান্নান। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি।

এদিকে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনায় বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা না গেলে সমাজে ‘খারাপ বার্তা’ যাবে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আইনমন্ত্রী বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে এই বিচারের প্রক্রিয়াটা সামনের দিকে দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য যা কিছু করা সম্ভব, আমরা সবকিছু করব। আমরা এটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।

এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে রামিসা ও সাম্প্রতিক ইস্যুতে এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেন, রামিসা হত্যাকা-ের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্রুত চার্জশিট দিয়ে অভিযুক্তকে বিচারের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি বিচারের দায়িত্ব আইন বিভাগের। আশা করি, সম্ভাব্য সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

রামিসার মৃত্যুতে শোকাহত শিয়ালদী গ্রাম

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে দাদা-দাদির পাশেই চিরঘুমে শায়িত ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের শিকার শিশু রামিসা আক্তার। গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার মধ্যম শিয়ালদী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাদা হেলালউদ্দিন মোল্লা ও দাদি আনোয়ারা বেগমের কবরের পাশে সমাহিত করা হয় রামিসাকে। এর আগে অ্যাম্বুলেন্সে করে তার লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হলে স্বজনদের কান্নায় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। রামিসার মৃতুতে শোকাহত মধ্যম শিয়ালদী গ্রাম। তারা রামিসার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।

গ্রামবাসীর মতোই রামিসার মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না ৯০ বছরের মজিবর রহমান মোল্লা। তিনি রামিসার চাচাতো দাদা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রামিসার কবরের পাশে তাকে অপলক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। রামিসার প্রতি অন্য রকম একটা মায়া ছিল দাদা মজিবর রহমানের। রামিসার মৃত্যুতে অনেকটা বাকরুদ্ধ তিনি।

রামিসার চাচাতো ভাই রানা মোল্লা বলেন, ঈদ কিংবা বিশেষ উৎসব ছাড়া তাদের গ্রামে খুব একটা আসা হতো না। রামিসা ছিল চঞ্চল ও প্রাণবন্ত স্বভাবের। গ্রামে এলেই সে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখত। সবার সঙ্গে সহজে মিশে যেত। ওর এমন মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না।

এদিকে রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার দ্রুত বিচারের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার দিকে উপজেলা মোড়ে জামায়াতে ইসলামী ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল করেছে। আগের দিন বুধবার দিনগত রাতে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে মুন্সীগঞ্জ শহরে মশাল মিছিল ও সমাবেশ হয়। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

এদিকে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের ঘটনায় পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সোহেল। এ ঘটনায় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

জুয়া-পরকীয়ার জন্য সোহেলকে বাড়ি থেকে বের করে দেন বাবা

সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, পরকীয়া, জুয়া আসক্ত ছিলেন রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও  হত্যাকা-ের মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা। পরকীয়ার কারণে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। এসব কারণে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন বাবা জাকির হোসেন। জুয়া খেলে প্রায় ১০ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন সোহেল। জমি বিক্রি করে সেই ঋণের কিছু টাকাও পরিশোধ করেন তার বাবা। বাড়ি থেকে ৩ বছর আগে বের করে দিলে নাটোরের সিংড়ার মহেশচন্দ্রপুরের বাড়িতে আর ফেরেননি সোহেল। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন অপকর্মে।

জানা যায়, নিজ ছোট ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্কে জড়ায় সোহেল। এ কারণে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় সোহেল। তার ছোট বোন জলি বেগম  বলেন, ৩ বছর আগে নানা অপকর্মের কারণে বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর তিনি আর কখনও বাড়িতে ফেরেননি, যোগাযোগও রাখেননি। তখন থেকে ঢাকায় থাকতেন ভাই। হঠাৎ টিভিতে তার খবর দেখে হতবাক হয়েছি।

স্থানীয় বাসিন্দা শহীদ আলী জানান, সোহেল প্রথম স্ত্রীকে ১২ বছর আগে তালাক দেন। ওই ঘরে আট মাস বয়সী একটি ছেল ছিল। তারপর দ্বিতীয় বিয়ে করেন সিংড়ার বালুয়া বাসুয়া এলাকায়। ওই বউকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।