নিরক্ষরতা উন্নয়নের অন্তরায়। সাক্ষরতা ও উন্নয়ন একই সূত্রে গাঁথা। টেকসই সমাজ গঠনের জন্য যে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন তা সাক্ষরতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সংখ্যাকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
ইসলামে ইমানের পর ‘ইলেম’ বা সাক্ষরতা, শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এই জ্ঞানার্জন সব মুমিন নর-নারীর জন্য ফরজ করা হয়েছে। এ জন্য অক্ষর জ্ঞানকে জ্ঞানের মূল বাহন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘পড়–ন আপনার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন রক্তপিণ্ড থেকে। পড়–ন, আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।’ (সুরা আলাক ১-৪)
রাসুল (সা.) সাক্ষরতা ও শিক্ষার অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন, বদরের যুদ্ধে কিছু কাফের যোদ্ধা বন্দি হন, যারা শিক্ষিত ছিলেন। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির উদ্দেশে রাসুল (সা.) কিছু সংখ্যক মুসলিম শিশু-কিশোরদের লেখাপড়া শেখানোর বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। (মুসনাদে আহমদ)
রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ। জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়, ‘তোমরা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো।’ সুতরাং বোঝা গেল শিক্ষার কোনো বয়স নেই, যেকোনো বয়সের লোকের জন্যই জ্ঞানার্জন আবশ্যক। আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল (সা.)-এর প্রতি সর্বপ্রথম ওহি ছিল শিক্ষাবিষয়ক। তাই তো রাসুল (সা.) পড়ার প্রতি আদিষ্ট হয়েছিলেন। রাসুল (সা.) কোথাও নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান বা সেনাপতি হিসেবে উল্লেখ করেননি। তিনি দুনিয়ার মানুষকে উত্তম চরিত্র ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে তুলতে এবং শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে ঘোষণা করেছিলেন, ‘নিশ্চয় আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি।’ অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘আমি মানুষকে উত্তম চরিত্র শিক্ষা দিতেই প্রেরিত হয়েছি।’
রাসুল (সা.) সুশিক্ষিত জাতি গঠনে মানবজাতির সামনে শিক্ষার মৌলিক নীতিমালা পেশ করেছেন। তিনি নবুওয়াত লাভের পর পবিত্র নগরী মক্কার সাফা পাহাড়ের সন্নিকটে ‘দারুল আরকাম’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। যা পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রথম শিক্ষালয়। মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের পর তিনি মসজিদে নববিতে তার শিক্ষার কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। যা আজও অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে রাসুল (সা.) এ মসজিদেই বাদ আসর নিয়মিত শিক্ষাদানে ব্যস্ত থাকতেন। সাহাবায়ে কেরাম তার নিকটে থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে মসজিদে নববিতে বসে থাকতেন।
এমনকি নারীদের জন্য তিনি আলাদাভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত মদিনা মুনাওয়ারায় ৯টি মসজিদ ছিল। প্রত্যেক মসজিদেই এলাকাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। যেখানে সব সময় কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি হাদিস ও দুনিয়াবি প্রয়োজনীয় অন্যান্য কল্যাণমুখী শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। এক কথায়, নিরক্ষরতা মুক্ত সমাজ গঠনে বিশ্বনবীর ভূমিকা ছিল অসপরিসীম। যেখানে কোনো বর্ণ-বৈষম্য ভেদাভেদ ছিল না। আরব-অনারব, ক্ষমতাশালী-নিরীহ, ধনী-গরিব সবাই সমভাবে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পেত।
ইসলামে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো, আদম সন্তানকে মানুষরূপে গড়ে তোলা। যে শিক্ষা আত্মপরিচয় দান করে, মানুষকে সৎ ও সুনাগরিক হিসেবে গঠন করে এবং পরোপকারী, কল্যাণকামী এবং মহান আল্লাহর প্রতি অনুরাগী হতে সাহায্য করে, সে শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে, অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচিত করে এবং দূরদর্শিতা সৃষ্টি করে। তাই আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে প্রথমে তার শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ৩১নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আল্লাহতায়ালা আদমকে সব বস্তুর নাম শেখালেন।’ মহান আল্লাহ আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ানোর তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক