সত্যের সন্ধান মানুষের সহজাত প্রবণতা। মানুষ জানতে চায়, সে কোথা থেকে এসেছে। কে তাকে সৃষ্টি করেছেন। জীবনের উদ্দেশ্য কী। কিন্তু সবাই সেই সত্যের কাছে পৌঁছাতে পারে না। কেউ সমাজকে অনুসরণ করে। কেউ পূর্বপুরুষের পথকে আঁকড়ে ধরে। আবার কেউ নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণে পথ হারিয়ে ফেলে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মানবজাতির জন্য এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের জীবন তুলে ধরেছেন, যিনি সত্যের সন্ধানে ছিলেন নির্ভীক। তিনি ছিলেন আল্লাহর খলিল, হজরত ইবরাহিম (আ.)। তিনি অন্ধ অনুসরণ করেননি। যুক্তি, চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সত্যকে খুঁজেছেন। এরপর দৃঢ়তার সঙ্গে সেই সত্যকে গ্রহণ করেছেন।
আল্লাহর পথে সত্যের অনুসন্ধান : ইবরাহিম (আ.) এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে মূর্তিপূজা ছিল সাধারণ বিষয়। অনেক মানুষ চাঁদ, তারা ও সূর্যের উপাসনা করত। তার নিজের পিতাও মূর্তি নির্মাণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। চারদিকে ছিল শিরক ও কুসংস্কারের আধিপত্য। কিন্তু তিনি প্রচলিত বিশ্বাসকে অন্ধভাবে গ্রহণ করেননি। তিনি সত্যকে জানতে চেয়েছিলেন। সঠিক পথের সন্ধান করেছিলেন।
কোরআন তার এই অনুসন্ধানী মানসিকতার কথা তুলে ধরেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই আমি ইবরাহিমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব দেখিয়েছিলাম, যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।’ (সুরা আনআম ৭৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সত্যের পথে পৌঁছানোর জন্য মহান আল্লাহ তাকে চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়েছিলেন। তার হৃদয়কে সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।
চাঁদ, তারা ও সূর্যের মাধ্যমে যুক্তি : সুরা আনআমে ইবরাহিম (আ.)-এর অত্যন্ত শিক্ষণীয় একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি প্রথমে একটি উজ্জ্বল তারা দেখে বলেন, ‘এটাই আমার প্রতিপালক।’ কিন্তু যখন তা অস্ত গেল, তখন বললেন, ‘আমি অস্তগামীকে ভালোবাসি না।’
এরপর তিনি চাঁদকে উদিত হতে দেখে একইভাবে বললেন। কিন্তু চাঁদও অস্ত গেলে তিনি বললেন, ‘যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ না দেখান, তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হবো।’ (সুরা আনআম ৭৭)
পরে তিনি সূর্যকে উদিত হতে দেখে বলেন, ‘এটাই আমার প্রতিপালক। এটি তো সবচেয়ে বড়।’ কিন্তু সূর্যও যখন অস্ত গেল, তখন তিনি ঘোষণা করলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর সঙ্গে যাদেরকে শরিক করো, আমি তা থেকে সম্পূর্ণ সম্পর্কমুক্ত। নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে নিবদ্ধ করেছি, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। আমি কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ (সুরা আনআম ৭৮-৭৯)
এটি ছিল জাতির সামনে তার একটি যুক্তিনির্ভর উপস্থাপনা। তিনি তাদের বোঝাতে চেয়েছিলেন, যা পরিবর্তনশীল, যা অস্ত যায়, যা নিজেই নিয়ন্ত্রিত, তা কখনো উপাস্য হতে পারে না। প্রকৃত উপাস্য সেই মহান সত্তা, যিনি সবকিছুর স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক।
ইবরাহিম (আ.)-এর যুক্তির মূল শিক্ষা ছিল অত্যন্ত সহজ। যে নিজেই পরিবর্তনের অধীন, সে অন্যের মাবুদ হতে পারে না। চাঁদ, তারা ও সূর্য মহান আল্লাহর সৃষ্টি। সেগুলো আল্লাহর বিধানের অধীন। তাই সৃষ্টিকে নয়, স্রষ্টার ইবাদত করতে হবে।
এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আধুনিক যুগে মানুষ হয়তো সূর্যের উপাসনা করে না। কিন্তু অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা প্রবৃত্তিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে। এগুলোও এক ধরনের ভ্রান্ত উপাসনা। একজন মুমিনের হৃদয়ে সর্বোচ্চ স্থান হবে শুধু আল্লাহর।
অন্ধ অনুসরণের বিপদ : ইবরাহিম (আ.) তার জাতির একটি বড় ভুল তুলে ধরেছিলেন। তারা শুধু পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করছিল। তারা সত্য যাচাই করার চেষ্টা করেনি। কোরআনে এসেছে, ‘ইবরাহিম তার পিতা আজরকে বললেন, আপনি কি মূর্তিগুলোকে উপাস্য বানিয়েছেন? নিশ্চয়ই আমি আপনাকে এবং আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে দেখছি।’ (সুরা আনআম ৭৪)
এই আয়াত শেখায়, মানুষের উচিত সত্যকে প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রহণ করা। শুধু সমাজের প্রচলিত রীতি বা পারিবারিক ঐতিহ্যকে সত্যের মানদণ্ড বানানো উচিত নয়।
নম্র ভাষায় দাওয়াত : যদিও তার পিতা শিরকে লিপ্ত ছিলেন, তবুও ইবরাহিম (আ.) প্রথমে অত্যন্ত সম্মান ও কোমল ভাষায় দাওয়াত দেন। কোরআনের অন্যত্র তার ভাষা তুলে ধরা হয়েছে, ‘হে আমার পিতা! আপনি এমন কিছুর ইবাদত কেন করেন, যা শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো উপকারও করতে পারে না?’ (সুরা মারইয়াম ৪২)
এটি দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সত্য কথা বলতে হবে। কিন্তু ভদ্রতা, প্রজ্ঞা ও উত্তম আচরণ বজায় রাখতে হবে।
যুক্তির মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা : ইবরাহিম (আ.) কখনো অযৌক্তিক বিতর্কে জড়াননি। তিনি যুক্তি ও বাস্তবতার মাধ্যমে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তার জাতি যখন তর্কে লিপ্ত হলো, তখন তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সত্যের কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করলেন। আল্লাহ বলেন, ‘তার সম্প্রদায় তার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হলো। তিনি বললেন, তোমরা কি আল্লাহ সম্পর্কে আমার সঙ্গে বিতর্ক করছ, অথচ তিনি আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন।’ (সুরা আনআম ৮০)
একজন দাঈর জন্য এটি বড় শিক্ষা। আবেগ নয়, যুক্তি। বিদ্বেষ নয়, প্রজ্ঞা। অপমান নয়, উত্তম ভাষা। এভাবেই মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরতে হবে।
পরীক্ষার মুখেও অবিচলতা : সত্য গ্রহণ করা সহজ। কিন্তু সত্যের ওপর অটল থাকা কঠিন। ইবরাহিম (আ.) এই কঠিন পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন। জাতি তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা হারাননি। আল্লাহ বলেন, ‘আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া ৬৯)
এই ঘটনা প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, আল্লাহ তাকে কখনো একা ছেড়ে দেন না।
আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা : ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তাওয়াক্কুলের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনি নিজের যুক্তির ওপর ভরসা করেননি। বরং আল্লাহর হেদায়েত কামনা করেছেন। এটা শেখায়, জ্ঞান ও বুদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আল্লাহর হেদায়েত ছাড়া মানুষ কখনো সত্যের পূর্ণতা লাভ করতে পারে না।
হাদিসের আলোকে শিক্ষা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ইলমের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা যায়, কোনো লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে কেয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ ৩৬৬৪)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, সত্য ও জ্ঞান অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি। ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসন্ধানও ছিল নিঃস্বার্থ। তিনি সত্যকে গ্রহণ করেছিলেন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
অপর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি ৫০২৭)
কোরআনই সত্যের সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ পথনির্দেশ। তাই সত্যের সন্ধানী মানুষের প্রথম কাজ হওয়া উচিত কোরআনের শিক্ষা গ্রহণ করা।
আমাদের জন্য শিক্ষা : আজকের পৃথিবীতে বিভ্রান্তির উৎস অনেক। সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার, বস্তুবাদ, কুসংস্কার, অন্ধ অনুসরণ এবং নানা ভ্রান্ত মতবাদ মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
লেখক : মাদ্রাসা শিক্ষক ও ইসলামি গবেষক
