চলতি বছরের ডিসেম্বরে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল করতে যাচ্ছে বিএনপি। তার আগে বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নতুন কমিটি ঘোষণা করবে দলটি। কোরবানির ঈদের পর ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ সংগঠনের শীর্ষ পদ পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন; তারা দৌড়ঝাঁপ করছেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, উল্লিখিত সংগঠন তিনটির শীর্ষ পদে যাদের নিয়ে আসা হবে, তাদের খসড়া তালিকা তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ঈদের পর কমিটি ঘোষণা করা হবে।
বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে বিএনপির সপ্তম কাউন্সিল। কোরবানির ঈদের পর বিশেষ করে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।’
ওই সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। উপদেষ্টারা দলের শক্তি বাড়াতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠন করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলকে মোকাবিলায় ওই তিন সংগঠন যাতে রাজপথে কর্মসূচি নিয়ে থাকতে পারে, সে জন্য নতুন কমিটি করার বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন তারা। এর পর সংগঠনগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন; সমর্থক নেতাকর্মীদের নিয়ে শোডাউন করছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৮ মার্চ প্রথমবারের মতো রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তখন ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। বৈঠকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান নতুন কমিটির বিষয়ে তাদের অভিমত চেয়ারম্যানকে জানান।
জানা গেছে, অঙ্গ সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রথমে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। ছাত্রদল থেকে যারা বাদ পড়বেন, তাদের যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাকি বাদপড়াদের বিএনপিতে জায়গা করে দেওয়া হবে।
ছাত্রদলের সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান। আলোচনায় আরও যারা রয়েছেন, তারা হলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, আজিজুল হক জিয়ন, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন, মাসুদুর রহমান, মো. বায়েজিদ হোসাইন ও ঢাবি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, তারিকুল ইসলাম তারিক, তারেক হাসান মামুন এবং কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মাহমুদ ইসলাম কাজল।
ছাত্রদলের সভাপতি পদে আসতে আগ্রহী জিয়ন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসেছে। মাঝে মধ্যে ব্যতিক্রম হয়েছে। সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্ররা জোরালো আন্দোলন করেছেন। আমরা চাই এবার ব্যতিক্রম হোক। এখন জেন জি ও আলফা জেনারেশনের যুগ। তাই আমরা চাই, বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক চর্চা করতে পারে, এমন নেতৃত্ব ছাত্রদলে আসুক। আশা করি, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি বিবেচনা করবেন।’
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরের নেতৃত্বাধীন কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা বিশ^াবদ্যালয় শাখার যে সাত সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল, তার মেয়াদও ইতিমধ্যে এক বছর অতিক্রম করেছে। ফলে কেন্দ্র থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র নতুন নেতৃত্বের দাবি উঠেছে।
যুবদল : ২০২৪ সালে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ কমিটির মেয়াদ প্রায় ২২ মাস অতিক্রম করলেও তা পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। যুবদলের নতুন কমিটি গঠনে রেওয়াজ হলো সর্বশেষ কমিটির সাধারণ সম্পাদককে সভাপতি করা। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুবদলের সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় সংসদ সদস্য ছিলেন। এর আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মন্ত্রী থাকাবস্থায় যুবদলের নেতৃত্বে ছিলেন। যুবদলের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী কি না জানতে চাইলে নয়ন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান দায়িত্ব দিলে নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করব।’
যুবদলের নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, সাবেক ১ম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন, সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল কবীর পল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন, যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক খন্দকার এনামূল হক এনাম, সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল।
আলোচনায় থাকা মামুন হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের সেনাপতি। তিনি যেখানে আমাকে দায়িত্ব দেবেন, সেখানে নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করব।’
সভাপতি প্রার্থী গোলাম মাওলা শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ত্যাগীরা মূল্যায়িত হলে সংগঠন শক্তিশালী হয়। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব দিলে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব।’
স্বেচ্ছাসেবক দল : স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটির শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, এক নম্বর সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মোখতার হোসাইন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক, আব্দুর রহিম হাওলাদার সেতু, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাদরেজ জামান এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন।
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকেও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদে যারা আলোচনায় রয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল ও সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির আলোচনায় থাকা নাজমুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাকে যোগ্য মনে করবেন তাকে সংগঠনের দায়িত্ব দেবেন। তার নেতৃত্বে আমরা কাজ করব।’
সভাপতি প্রার্থী ফখরুল ইসলাম রবিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে মহানগর ছাত্রদলের রাজনীতি করেছি। ২০১৭ সাল থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতি করছি; বর্তমানে এক নম্বর সহসভাপতি। আমাদের অভিভাবক যোগ্য মনে করলে এবং দায়িত্ব দিলে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব।’
২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জিলানীকে সভাপতি ও রাজীবকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ তিন বছর। বর্তমানে কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।