পাহাড়ে ঘোরাঘুরি পুরনো অভ্যাস। বান্দরবানের উঁচু-উঁচু পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা মেঘপুঞ্জ দেখে শহরে ফিরছি। সুবিশাল শৈলসারির গায়ে চনমনে রোদ। এই উপচানো রোদের ভেতর এক ধরনের মুগ্ধতা আছে। আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে গাড়ি নামছে সমতলের দিকে। পথের দুপাশে সাজানো বৈভবগুলো মনের গহনে তুলে রাখছি। একটি মোড় ঘুরতেই হঠাৎ চটকদারি রঙের কিছু একটা চোখের ফ্রেম থেকে দ্রুত সরে গেল। গাড়ি থামিয়ে ফিরে এলাম পেছনে। ভুল দেখিনি।
কয়েক গুচ্ছ সুদর্শন বুনোফুল পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা ঘনবব্ধ ঝোপের ওপর রঙের পসরা সাজিয়ে বসেছে। একটু সময় লাগলেও গন্ধভাদালির ফুলকে চিনতে অসুবিধা হলো না। তবে গড়নের দিক থেকে সমতলের তুলনায় পাহাড়ের গাছগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম। পাতাগুলো আকারে বড়। তা ছাড়া ধোয়ামোছা প্রকৃতিতে সবুজের পটভূমিতে ফুলের এই স্নিগ্ধ শোভা ভিন্ন এক আবহ তৈরি করেছে। আগে অনেকবার গন্ধভাদালির গাছ দেখেছি। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ফুলের দেখা পেলাম এই প্রথম। গাছটি অঞ্চলভেদে একাধিক নামে পরিচিত গন্ধবাদালি, বাদালি-বাদুলিয়া, গন্ধাল, মধুলতা ইত্যাদি।
গন্ধভাদালি (Paederia foetida) পেঁচানো লতার গাছ। লতা-পাতা উগ্রগন্ধি হওয়ায় সম্ভবত এমন নামকরণ। সাধারণত অন্য গাছ বা বাহন পেলে স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে উঠতে পারে। পাতা ডিম্বাকৃতি, সজোড় ও বিপরীতমুখী, ৫ থেকে ১৫ সেমি লম্বা, ২ সেমি চওড়া, গোড়ার দিকে সরু। ফুল নলাকার, গোলাপি বা নীলচে বেগুনি রঙের। পুষ্পদ- ৫ থেকে ১৫ সেমি লম্বা, পাপড়ি সংখ্যা ৫। বীজ গোলাকার, চ্যাপটা, হলুদ বা লালচে বাদামি রঙের। ফুল ফোটে শরতে, ফল পাকে শীতে। বীজ থেকে চারা হয়। দেশের সর্বত্রই দেখা যায়। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত বোটানিক্যাল গার্ডেনেও আছে। ভারত, নেপাল, ইন্দোচীন, মিয়ানমার, মালায়া, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ায় সহজলভ্য।
আমাদের লোকজীবনে গাছটির ব্যবহার অতিপ্রাচীন। এ গাছের পাতা প্রদাহ নাশ করে। তা ছাড়া উদরাময়, অর্শরোগ, অরুচি, পক্ষাঘাত এবং বাত রোগেও উপকারী। পেটের সমস্যায় পাতা পানিতে জ্বাল দিয়ে ঝোল করে ভাতের সঙ্গে অথবা পাতার রস ৩-৪ চামচ অল্প গরম করে মধুর সঙ্গে মিশিয়ে প্রতিদিন ২-৩ বার করে খেলে উপকার পাওয়া যায়। শারীরিক দুর্বলতা, অরুচি ও বাতের ব্যথায় পাতা ও কচি ডগা কুচি কুচি করে কেটে প্রয়োজনীয় মসলাপাতি দিয়ে পিঁয়াজু বানিয়ে খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়। পা-ফোলা ও পক্ষাঘাতে পাতার রস এককোষ রসুন মিশিয়ে খেলে আরোগ্য হয়। অর্শরোগে ২ চামচ পাতার রস ৩ গ্রাম কাঁচা হলুদ বাটার সঙ্গে মিশয়ে নিয়মিত খেলে কয়েক মাসের মধ্যেই রোগ সেরে যায়।
লেখক : উদ্ভিদ, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক