শিবির-ছাত্রলীগ মুখোমুখি সংঘর্ষ, চরম উত্তেজনা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

প্রক্টর কার্যালয়ে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগকর্মীকে মারধরের ঘটনা কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) দিনভর হামলা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে রাকসু কার্যালয়ে হামলায় রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আহত হন। এরপর ধাওয়া দিয়ে ওই কর্মীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে মারধর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাবি ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের ধরতে আলটিমেটাম দিয়েছে ছাত্রশিবির। গতকাল সোমবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় ছাত্রলীগকর্মী অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে দ্রুত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

রাকসু সূত্র জানায়, নারীঘটিত একটি বিষয় নিয়ে গত রবিবার রাতে এক সাবেক ছাত্রলীগকর্মী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে যান। এ সময় প্রক্টরের সঙ্গে তার বাগ্বিতন্ডা হয়। পরে তার মোবাইল ফোনে ছাত্রলীগসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য পাওয়ার দাবি তোলেন উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষার্থী। পরে তাকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকর্মী হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এরপর সেখানে রাকসু জিএস আম্মারসহ কয়েকজনের সঙ্গে ওই ছাত্রলীগকর্মীর হাতাহাতি ও মারধরের ঘটনা ঘটে।

গতকাল সোমবার দুপুরে ওই ছাত্রলীগকর্মী কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে রাকসু কার্যালয়ে হামলা চালান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার এবং রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিবসহ তিনজন। এদের মধ্যে আম্মার ও সাকিব আহত হন।

এ ঘটনার পর রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অভিযুক্তদের ধাওয়া করলে সংঘর্ষ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভেতরে প্রবেশ করেন। আহত ছাত্রলীগকর্মীকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় সেখান থেকে নামিয়ে আবারও মারধর করা হয়। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অভিযুক্তদের এক ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দেন। এ সময় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয়।

এ বিষয়ে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব বলেন, ‘প্রক্টর অফিস থেকে যাওয়ার পর খুব বেশি দেরি করেনি ওরা। ৪-৫ মিনিটের মধ্যে তারা রাকসু ভবনে আসে। ওদের মধ্য থেকে একজন আম্মারকে জিজ্ঞেস করে ‘তুই ওর গায়ে হাত দিছিস কেন?’ তখন আম্মার বলে, আপনি কী কোনো অথরিটির নাকি যে আপনার কাছে প্রশ্নের জবাব দিতে হবে?’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ওরা আম্মারের ওপর হামলা করে এবং আমি ওদেরকে ফেরাতে গিয়ে ওরা আমার ওপর হামলা করে রক্তাক্ত করে। ছাত্রলীগের আনাস ও তার সঙ্গে ৭ থেকে ৮ জন সাঙ্গপাঙ্গরা মিলে এ ঘটনা ঘটায়।

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘তারা ৬ থেকে ৭ জন হঠাৎ করেই কোনো ধরনের কথা না বলে আমাদের ওপর হামলা চালায়। তখন রাকসু কার্যালয়ের ভেতরে আমরা মাত্র তিনজন ছিলাম। হামলায় আমাদের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক গুরুতর আহত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই আজকের এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ক্যাম্পাসের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হামলার ঘটনার পর রাবি উপাচার্যের সঙ্গে রাকসু ও শিবির প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপনারা যেমন ছিলেন, আমরাও ছিলাম। আমরা কি বুঝি না যে, তারা আবার এলে কী হবে? পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে আমার এ ব্যাপারে কথা হচ্ছে। এ ঘটনার প্রতিফলন আপনারা অবশ্যই দেখবেন। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংসের ওপর ভিত্তি করেই তাদের শাস্তি হবে। আমরা এমন কোনো বিচার করব না যে, বিচারের দুর্বলতা তারা পায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এখনই গঠন করব আমরা।

এদিকে রাবি রাকসু ভবনে হামলার ঘটনার পর অভিযুক্তদের ‘সেফ এক্সিট’ দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভে নামেন রাকসু ও হল সংসদের নেতারা। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। পরে উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। সোমবার বিকেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকা ও প্রশাসনিক ভবনের সামনে দফায় দফায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় উপাচার্যের সঙ্গে রাকসু, হল সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের বৈঠক শেষে জানানো হয়,  ছাত্রলীগকর্মী অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে দ্রুত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বৈঠক শেষে রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘ভিসি স্যার এক ঘণ্টা সময় চেয়েছিলেন। সেই সময়ের মধ্যেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। অভিযুক্ত দুজনকে পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। তবে আমরা চাই, এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হোক।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিল ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। সে অনুযায়ী আনাস ও হাসান নামে দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করেছে। শিক্ষার্থীদের আরেকটি দাবি ছিল ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে কমিটি গঠন। ভিসি স্যার খুব দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা খুব দ্রুত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এর আগে রাকসু ভবনে হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন রাকসু ও হল সংসদের নেতারা। পরে উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রশাসনের সিদ্ধান্তে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত