জমে উঠছে বাজার

রাজধানীতে ধীরে ধীরে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। এখনো পুরোপুরি জমজমাট বেচাকেনা শুরু না হলেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে হাটজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ঈদের আমেজ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রাকে ট্রাকে গরু এসে পৌঁছাচ্ছে ঢাকার হাটগুলোতে। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে হাটে ঘুরতে আসেন অনেকেই। তবে এখনই কোরবানির পশু কেনার সিদ্ধান্ত নেননি ঢাকার বাসিন্দারা।

তারা বলছেন, ঈদের এক দুই দিন আগে কোরবানির পশু কিনবেন। কেননা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোরবানির পশু লালনপালন করার মতো পরিবেশ বাসাবাড়িতে নেই। তবে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গরু দেখতে হাটে যেতে ভুল করেননি তারা। ঘুরে ঘুরে গরু দেখা আর ছবি তোলা ঈদের আগাম আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছে নগরবাসীর মনে।

সরেজমিন দেখা গেছে, হাটগুলোতে ট্রাকভর্তি গরু নিয়ে আসছেন ব্যাপারীরা। ট্রাক থেকে গরু নামানোর দৃশ্য অনেকেই দাঁড়িয়ে ক্যামেরাবন্দি করছেন। আবার কেউ পছন্দের গরুর সঙ্গে তুলছেন সেলফি। আগে থেকে হাটে আসা ব্যাপারীরা তাদের পশুর পরিচর্যা করছেন, কেউ খাবার দিচ্ছেন, কেউবা সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে দরদাম করছেন।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়াসংলগ্ন কাজলা-মৃধাবাড়ী হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাক ও ট্রলারে করে গরু আনা হচ্ছে। মূল সড়কের পাশাপাশি আশপাশের শাখা সড়কগুলোতেও গরু বেঁধে রাখতে দেখা গেছে। হাটের ইজারাদার কে বি ট্রেড্রার্সের মালিক মো. শামীম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষ হাটে আসছে। উৎসবমুখর পরিবেশে গরু দেখছেন, দামদর করছেন। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি শুরু হয়নি।’

হাসনাবাদ হাটে দেখা গেছে, কুষ্টিয়ার দীপ্তিপাড়া বৈশাডাঙ্গা গ্রাম থেকে সাত খামারি মিলে ৬৭টি গরু নিয়ে গত বৃহস্পতিবার হাসনাবাদ হাটে আসেন ইসকান্দর আলী খান ও তার ভাতিজা মো. বাদশা খাঁ। তারা জানান, এক বছর ধরে পালন করা সাতটি গরু এবার কোরবানির জন্য এনেছেন। প্রতিটি গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে এক লাখ ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা।

ইসকান্দর আলী বলেন, ‘আশা করছি শনিবার থেকে বিক্রি বাড়বে।’ ছেলেমেয়েকে নিয়ে হাটে গরু দেখতে এসেছেন আফরোজা আক্তার টুম্পা। তিনি বলেন, ‘দেশি ও সুন্দর রঙের গরুর দাম অনেক বেশি। সাড়ে পাঁচ মণের একটি গরুর দাম চাচ্ছে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা। তাই বাজেট অনুযায়ী ছোট গরু দেখছি।’ হাটের ইজারাদার হাজি মো. সেলিম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গরু আসার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। শনিবার থেকে বেচাকেনা পুরোদমে শুরু হতে পারে।’

গতকাল জুমার নামাজের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্রাদার্স ক্লাবসংলগ্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটের প্রবেশমুখে সারি সারি দেশি গরু বাঁধা। কোথাও ছোট আকারের গরু, কোথাও মাঝারি, আবার কোথাও বড় আকৃতির বিদেশি জাতের গরু ঘিরে মানুষের ভিড়।

কেনাবেচা শুরু না হলেও হাটে ঈদের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। অনেকে পরিবার নিয়ে পছন্দের গরুর সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছেন। বালকদের কারও কারও মধ্যে দেখার বাড়তি উচ্ছ্বাসও চোখে পড়েছে। বড় আকৃতির গরুর সামনে দাঁড়িয়ে অনেককে ভিডিও করতে ও সামাজিক মাধ্যমে লাইভ পোস্ট দিতে দেখা গেছে।

তেজগাঁওয়ে পশুর হাটে উটের দেখা মিলেছে। উট দেখতে ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

সিরাজগঞ্জের চৌহালীর যমুনার চর এলাকা থেকে আসা গরুবিক্রেতা আব্দুর রউফ ভোর রাতে হাটে পৌঁছেছেন। সঙ্গে এনেছেন ১৫টি গরু। গরুগুলোকে খড় খাওয়ানোর ফাঁকে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন,

 ‘মানুষ আসে, গরু দেখে, দাম জিগায়। কিন্তু এখনো কেউ গরু কিনতেছে না। সবাই মনে হয় বাজার বুঝতেছে। তবে আশা করি, সামনের দুই-এক দিনের মধ্যে হাট জমে উঠবে।’

হাট ঘুরে দেখা গেছে, বিক্রেতারা গরুর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ গরুকে গোসল করাচ্ছেন, আবার কেউ মোবাইলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অনেকেই গরুর পাশে দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দাম হাঁকছেন। তবে বেশিরভাগ ক্রেতাকে এখনো ‘দাম যাচাই’ পর্যায়ে দেখা গেছে।

কুষ্টিয়া থেকে আসা সুমন নামের এক বিক্রেতা প্রায় ২০টি গরু নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, তার গরুগুলোর দাম দুই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা। তিনি বলেন, এখন বেচাকেনা কম। মানুষ ঘুরে ঘুরে বাজার দেখছে। তবে শেষ দিকে চাপ বাড়বে বলেই আশা করছি।  সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও এনায়েতপুর থেকে আসা কয়েকজন ব্যাপারীর সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা জানান, অতিরিক্ত লাভের চিন্তা না করে দ্রুত বিক্রির দিকেই নজর তাদের।

পশুর হাটকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। হাটের বিভিন্ন স্থানে র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। জাল টাকা প্রতিরোধ, চুরি-ছিনতাই ঠেকানো এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা কাজ করছেন। গতকাল শুক্রবার শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ পশুর হাট ঘুরে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। হাটের মূল জায়াগায় গরু দিয়ে ভর্তি হয়ে গেছে। এখানে অনেকেই আসছেন পশুর দাম যাচাই করতে। আবার কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতেও এসেছেন।

রাজধানীর শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা শাহেদ আলম ছুটির দিনে ছেলেমেয়েকে নিয়ে গরু দেখতে এসেছেন হাটে। তাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন, দামও যাচাই করছেন। তবে এখনই গরু কেনার পরিকল্পনা নেই তার। দেশ রূপান্তরকে শাহেদ বলেন, ‘ভাড়া বাসায় থাকি, গরু রাখার জায়গা নেই। তাই আগে কিনে ঝামেলায় যেতে চাই না। ঈদের দুই একদিন আগে এসে গরু কিনব। আজকে মূলত ছেলেমেয়েদের নিয়ে গরু দেখতে এসেছি।’

খিলগাঁও এলাকা থেকে ছেলেকে নিয়ে হাটে এসেছেন হাসান। একের পর এক গরু দেখছেন আর দাম জিজ্ঞেস করছেন। গরু পছন্দ হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আজকে ছুটির দিন, তাই ছেলেকে নিয়ে গরু দেখতে এসেছি। এখনো গরুর দাম বেশি, কয়েকদিন পর কিনব।’

জিনাইদহের হরিণাকু-ু থেকে গত ১৮ মে পাঁচটি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন গরুবিক্রেতা বুলু। আসার পথে চোখের ওপর আঘাত পেলেও তা উপেক্ষা করে তিনি এখনো হাটে অবস্থান করছেন। আশানুরূপ দাম পেলে আঘাতের কষ্ট ভুলে স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। বুলুর সঙ্গে হরিণাকুন্ডু থেকে আরও ১২ থেকে ১৩ জন বিক্রেতাও হাটে গরু এনেছেন। ক্রেতার ভিড় না থাকায় তারা পালা করে একেকজন গরুর পাহারায় থাকছেন।

মনিজ মোর্তজা চাকরির পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতে গরু পালন করেন। জামালপুর থেকে নিজের ফার্মের সাতটি গরু নিয়ে তিনি হাটে এসেছেন। দেশ রূপান্তরকে মনিজ বলেন, ‘গরুগুলো আজই হাটে নিয়ে এসেছি। অনলাইনে এর মধ্যে দুটি গরু বিক্রি হয়েছে, তবে হাটে এখনো বিক্রি হয়নি। বড় গরুটার দাম ৫ লাখ বলেছি, এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে।’

হাটে শৃঙ্খলা তদারকির দায়িত্বে থাকা কাজি নিজাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গরুর দাম এখনো অনেক বেশি। আর ক্রেতাও অনেক কম। কাল পরশুর দিকে হাট জমে উঠবে।’ গতকাল এ হাটে ৩০টি গরু বিক্রি হয়েছে বলে তিনি জানান।

শাহজাহানপুরের এই হাটে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু নিয়ে আসেন বিক্রেতারা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গরু ঝিনাইদহ থেকে এসেছে। এছাড়া চুয়াডাঙ্গা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও গরু নিয়ে আসতে দেখা যায় বিক্রেতাদের। টাকা লেনদেনে হাটটিতে বসানো হয়েছে দুটি সিআরএম/এটিএম মেশিন। গ্রাহকরা একসঙ্গে ৭০ হাজার টাকা জমা ও ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। এ ছাড়া অ্যাকাউন্টের সর্বোচ্চ লিমিট পর্যন্ত লেনদেন করতে পারবেন বলে জানান ব্যাংকের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।