আশ্বাসের ১৩ বছর, তবুও অচল মালঞ্চি রেলস্টেশন

নাটোরের বাগাতিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী মালঞ্চি রেলওয়ে স্টেশনটি দীর্ঘ ১৩ বছরেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। মাঝখানে সীমিত পরিসরে চালু হলেও কয়েক মাসের মাথায় আবারও বন্ধ হয়ে যায় কার্যক্রম। বর্তমানে স্টেশনের কক্ষগুলোতে ঝুলছে তালা, প্ল্যাটফর্মজুড়ে জন্মেছে ঝোপঝাড়। এখানে নেই কোনো সিগন্যাল ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় জনবল। বরং সিগন্যাল ব্যবস্থার যে তার, খুঁটি জাতীয় যে সরঞ্জাম ছিল তাও ধীরে ধীরে আপসারণ করা হচ্ছে। ফলে স্টেশনটি বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। স্থানীয়দের দাবি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শুধু মিথ্যা আশ্বাসের পর আশ্বাসে কেটে গেছে ১৩টি বছর। কিন্তু স্টেশনটির ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি।

দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, সিগন্যাল ব্যবস্থা পুনরায় চালু এবং নিয়মিত ট্রেন স্টপেজ নিশ্চিত করে মালঞ্চি রেলস্টেশনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি এলাকাবাসীর। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, আপাতত রেলস্টেশনটি চালুর সম্ভাবনা নেই। একদিকে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের বারবার আশ্বাস, অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের স্টেশনসংক্রান্ত কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ায় কারণে স্থানীয় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।

স্টেশনটি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (বাউয়েট) শিক্ষার্থী, কাদিরাবাদ সেনানিবাসে কর্মরত সদস্য, স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ যাত্রীরা। ঢাকাগামী ট্রেনে যাতায়াতের জন্য বাধ্য হয়ে অনেককে জেলা সদর রেলস্টেশন কিংবা পার্শ্ববর্তী উপজেলার আব্দুলপুর রেল জংশন যেতে হচ্ছে, যা সময় ও খরচ দুটোই বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টিতে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এলাকায় কোনো বাস টার্মিনাল না থাকায় যাত্রীদের বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থাও সীমিত। অন্যদিকে কৃষকদের কৃষিপণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে, ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। স্থানীয়দের দাবি, জনদুর্ভোগ কমাতে এবং এলাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে দ্রুত স্টেশনটি পুনরায় চালু করার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মালঞ্চি রেলস্টেশনটি এক সময় উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম ছিল। বিশেষ করে বাগাতিপাড়ায় সরাসরি কোনো বাস টার্মিনাল না থাকায় এখানকার মানুষের প্রধান ভরসা ছিল রেলপথ। কিন্তু ২০০৩ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে স্টেশনের জনবল কমতে থাকে। একপর্যায়ে কর্মচারী শূন্য হয়ে ২০১৩ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় স্টেশনটি। দীর্ঘ এক দশক বন্ধ থাকার পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সীমিত পরিসরে স্টেশনটি চালু করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও বন্ধ হয়ে যায় কার্যক্রম। বর্তমানে শুধু রকেট মেইল (চিলাহাটি হতে খুলনাগামী) ট্রেনটি অল্প সময়ের জন্য স্টেশনে থামে। তবে সেটিও প্ল্যাটফর্মে নয়, এক নম্বর লাইনে দাঁড়ায়, যা প্ল্যাটফর্ম ছাড়া। এতে নারী, শিশু ও বয়স্কযাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওঠানামা করতে হয়। স্টেশনের টিকিট কাউন্টার, স্টেশন মাস্টারের কক্ষ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি মাঝখানে কিছু মেরামত করা হলেও আবার দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। রেলক্রসিংয়ের জন্য তিনটি লাইনের ব্যবস্থা থাকলেও পয়েন্টসম্যান না থাকায় বর্তমানে শুধু মূল লাইনে ট্রেন চলাচল করছে। বাকি দুটি লাইনের একটি লাইনে আগাছায় ঢেকে প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

রেলের প্ল্যাটফর্মে চা দোকান মালিক আদম আলী (৪৫) বলেন, ‘রেলস্টেশনটি সচল থাকলে মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার লাঘব হতো, পাশাপাশি স্থানীয় দোকানপাটেও বেচাকেনা বাড়ত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনটি প্রায় অচল থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’ জনদুর্ভোগ কমানো এবং এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে দ্রুত স্টেশনটি চালুর দাবি জানান তিনি। রেলস্টেশনের কুলি সরদার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এই স্টেশনে প্রায় ১৪ জন কুলি কাজ করেন। কিন্তু মাত্র একটি ট্রেন রকেট মেইল এখানে থামে। সেটিও প্ল্যাটফর্মে না থেমে ১ নম্বর লাইনে দাঁড়ায়। ফলে বুকিং করা মালামাল ওঠানামা করতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।’

পার্শ্ববর্তী আব্দুলপুর রেল জংশনের স্টেশন মাস্টার জামিল জানান, তারা বর্তমানে নাটোর রেলস্টেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে ট্রেন ক্রসিংয়ের কাজ পরিচালনা করছেন। এতে তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং অনেক সময় ট্রেনের সময়সূচিতে বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, মাঝখানে মালঞ্চি রেলস্টেশন চালু থাকলে পরিচালনাগত সুবিধা বাড়বে, ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়ও কমে আসবে। পাশাপাশি যাত্রীরাও আরও ভালো সেবা পাবে।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফারিদ আহমেদ জানান, জনবল সংকটের কারণে অনেক রেলস্টেশনই চালু কার সম্ভব হচ্ছে না। জনবল নিয়োগ হলে কিছু কিছু স্টেশন চালু করা হবে। আর মালঞ্চি রেলস্টেশনটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানান তিনি।