প্রদর্শনী

রাজধানীতে পোড়ামাটির রূপবৈচিত্র্য

নব্যপ্রস্তর যুগ থেকেই মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জীবনে মাটির ব্যবহার শুরু হয়। প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা মৃৎশিল্পের অন্যতম প্রাচীন বিকাশকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সে সময় মানুষ পোড়ামাটির পাত্র ও ইট তৈরি করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করত। কাদামাটি কুম্ভাকারের হাতে রূপ পেত নানান তৈজসপত্রে আর আগুনে পোড়ানোর মধ্য দিয়ে তা হয়ে উঠত ব্যবহারযোগ্য শিল্পপণ্য। ব্যবহার ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী মৃৎশিল্পকে নিত্যপ্রয়োজনীয়, শৌখিন, চিত্রিত, নকশাকৃত, খেলনা কিংবা পূজা-পার্বণে ব্যবহৃত সামগ্রী—এমন নানা ভাগে বিভক্ত করা যায়।

গোলাকার বা কুম্ভাকৃতির পাত্রই মাটির পাত্রের প্রাচীনতম রূপ। তবে আধুনিক সময়ে সিনথেটিক পণ্যের সহজলভ্যতা, কম দাম ও আকর্ষণীয় প্রচারের কারণে মাটির তৈরি জিনিস ধীরে ধীরে মানুষের জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এতে সংকটে পড়ছেন মৃৎশিল্পীরা। সেই ভাবনা থেকেই নিজেদের শিল্প ও পণ্যের প্রচার-প্রসারে আয়োজন করা হয়েছে প্রদর্শনী ‘পোড়ামাটির রূপবৈচিত্র্য’।

প্রদর্শনীতে মাটির তৈরি সামগ্রীগুলো ধরনভেদে নান্দনিকভাবে সাজানো হয়েছে, যা দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। সাধারণ মাটি—শিল্পীর সৃজনশীল স্পর্শে কীভাবে অসাধারণ রূপ নেয়, তারই এক অনন্য উপস্থাপন ছিল এই আয়োজন।

প্রাচীন মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের প্রধান উপকরণ ছিল কুম্ভ বা কলসি। ‘কুম্ভ’ শব্দের অর্থ গোল বা বৃত্ত—যেমন পৃথিবী, জীবনচক্র কিংবা মানুষের ভাবনাও এক অর্থে বৃত্তাকার। জল ধারণের আধার হিসেবেই কলসির উৎপত্তি। বাংলার গ্রামীণ জীবনে গোলাকার মটকিতে চাল, বীজ, পানীয়, শুঁটকি ও প্রয়োজনীয় নানা জিনিস সংরক্ষণ করা হতো।

মৃৎশিল্পের আরেকটি আকর্ষণীয় ধারা হলো টেপা পুতুল। একসময় পাল বাড়িতে অবশিষ্ট মাটি দিয়ে শিশুদের খেলনার জন্য ছোট ছোট পুতুল তৈরি করা হতো। সেখান থেকেই টেপা পুতুলের সূচনা। হাতে টিপে তৈরি বলেই এর নাম টেপা পুতুল। বর্তমানে এটি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে গৃহসজ্জাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

গ্যালারির এক পাশে দেখা গেল মাটি ও বাঁশের সমন্বয়ে তৈরি বিশেষ কিছু পাত্র। কোনোটি লম্বাটে ফুলদানির মতো, আবার কোনোটি গোলাকার। নকশা ও গঠনে এগুলোর সঙ্গে আফ্রিকান মৃৎশিল্পের কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। একসময় এ ধরনের পাত্র আফ্রিকায় খাদ্য রপ্তানির কাজে ব্যবহারের জন্য মধুপুরের মৃৎশিল্পীরা তৈরি করত।

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে নন্দন ঘটও। আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় মানবদেহকে ‘দেহঘট’ বলা হয়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও মাৎসর্য মানুষের পঞ্চবৃত্তির প্রতীক পঞ্চশস্য। তার ওপর ঘট স্থাপন করা হয়। ঘটে দেহরস অর্থাৎ জল ঢেলে পূর্ণ করা হয়। এর গলায় পঞ্চপল্লব ও ওপরে ডাব বসিয়ে মানবদেহের প্রতিরূপ কল্পনা করা হয়। হিন্দুধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ঘটের গুরুত্ব অপরিসীম। একই সঙ্গে এটি নারীগর্ভের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

লক্ষ্মীসরা মৃৎশিল্পের আরেকটি জনপ্রিয় ধারা। সরা মূলত থালার তুলনায় ছোট ও কম গভীরতাসম্পন্ন পাত্র। সেই সরায় যখন দেবী লক্ষ্মীর ছবি আঁকা হয়, তখন তাকে লক্ষ্মীসরা বলা হয়। কৃষিনির্ভর বাংলায় দেবী লক্ষ্মীকে ফসল ও সমৃদ্ধির দেবী হিসেবে মানা হয়। এ প্রদর্শনীতে লক্ষ্মীসরার পাশাপাশি রাধাকৃষ্ণ, দুর্গা ও বিষ্ণুর চিত্রাঙ্কিত সরাও প্রদর্শিত হয়েছে।

বর্তমান সময়ে মাটির পণ্যের ব্যবহার আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। বিয়ের কার্ড, শোপিস, টব, ল্যাম্প, ফুলদানি থেকে শুরু করে রপ্তানিযোগ্য নানা সামগ্রীতেও মাটির ব্যবহার বাড়ছে। মৃৎশিল্পকে আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দেওয়া এবং শিল্পীদের পেশাগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রদর্শনী গুরুত্বপূর্ণ। প্রদর্শনীর পাশাপাশি ছিল লোকসাংস্কৃতিক পরিবেশনাও।

গত ১৯ থেকে ২২ মে রাজধানীর আলিয়ঁঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা গ্যালারিতে চারদিনব্যাপী এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।