বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যকলার ইতিহাসে নভেরা আহমেদ এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এমন এক সময়ে তিনি ভাস্কর্যচর্চা শুরু করেছিলেন, যখন এ দেশে এই শিল্পমাধ্যমের তেমন কোনো প্রতিষ্ঠিত ধারা গড়ে ওঠেনি। সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় একজন নারী হিসেবে ভাস্কর হওয়ার সাহসিকতা ছিল যুগান্তকারী। তার শিল্পচর্চা তাই ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার বেশি কিছু—সময়, সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
নভেরা আহমেদ বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, পুরাণ, ঐতিহ্য এবং মানুষের জীবনবোধকে আধুনিক শিল্পভাষায় নতুন রূপ দিয়েছেন। তার শিল্পকর্মে যেমন ব্যক্তিমানসের টানাপড়েন ধরা পড়ে, তেমনি প্রতিফলিত হয় এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের অভিঘাত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী অস্থির সময়ে তার বেড়ে ওঠা; ফলে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রামের চেতনা এবং জাতির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান তার শিল্পভাবনাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহেরও তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। স্থপতি হামিদুর রহমানের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক গৌরবময় সংযোজন।
ছোট্ট একটি পরিসর থেকে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে পৌঁছে নভেরা বিশ্বরাজনীতি ও সমকালীন বাস্তবতার নানা অনুষঙ্গকে নিজের শিল্পে ধারণ করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধ ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শিল্পভাষার যে পরিবর্তন ঘটেছিল, তারও একজন সাক্ষী ছিলেন তিনি।
নভেরা প্রচলিত অভিজাত ভাস্কর্যের ধারা থেকে সরে এসে বাংলার গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য, কৃষক, গৃহস্থ, নারী-পুরুষ ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে শিল্পের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তার ভাস্কর্যে মানবজীবনের সহজ, সংক্ষিপ্ত ও স্বাভাবিক প্রকাশ দেখা যায়, যা পুরোপুরি মূর্তও নয়, আবার সম্পূর্ণ বিমূর্তও নয়। তার শিল্পের প্রধান মোটিফ ছিল মানুষ ও প্রকৃতি।
প্যারিসে অবস্থানকালে তিনি সমকালীন ইউরোপীয় আধুনিক ভাস্করদের সংস্পর্শে আসেন। বিশেষ করে কনস্টান্টিন ব্রাঙ্কুশির সরলীকৃত ফর্ম এবং হেনরি মুরের মানবদেহভিত্তিক জৈব ও শূন্যতানির্ভর ভাস্কর্যধারার প্রভাব তার কাজে লক্ষণীয়। তবে তিনি এই প্রভাবকে অনুকরণে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে একীভূত করে নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র শিল্পভাষা। বাস্তবধর্মী উপস্থাপনার পরিবর্তে তিনি জ্যামিতিক, সরলীকৃত ও আধা-বিমূর্ত ফর্মের মাধ্যমে মানুষের জীবন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৃতির আদিম শক্তিকে প্রকাশ করেছেন।
পাথর, কাঠ ও ব্রোঞ্জের মতো উপকরণ তার হাতে কেবল মাধ্যম হয়ে থাকেনি, শিল্পের অবিচ্ছেদ্য ভাষায় পরিণত হয়েছে। পশু-পাখির ফর্ম, মানবদেহের সরলীকরণ এবং প্রাকৃতিক প্রবাহ তার শিল্পকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য।
সম্প্রতি হয়ে যাওয়া প্রদর্শনীতে নভেরা আহমেদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ও উঠে এসেছে—তিনি ছিলেন একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী। ভাস্কর্যের পাশাপাশি তার আঁকা একাধিক অ্যাক্রেলিক চিত্রকর্মও প্রদর্শিত হয়েছে, যা তার বহুমাত্রিক শিল্পসত্তার পরিচয় বহন করে।
জীবনের শেষ পর্বে নভেরা নিজেকে জনসমাজ থেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করলেও নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন আজীবন। তার এই নীরবতা ও অন্তরালবাস যেন তাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। ২০১৫ সালে প্যারিসে তার দেহাবসান হলেও; তিনি রয়ে গেছেন দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক ভাস্কর্যচিন্তার অন্যতম পথিকৃৎ ও মৌলিক শিল্পী হিসেবে।
নভেরা আহমেদের স্মৃতি ও শিল্পকর্মকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ‘নভেরা’ শীর্ষক এই বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। জাদুঘরের সংগ্রহে সংরক্ষিত তার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্মগুলো বৃহত্তর দর্শকের সামনে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব। পাশাপাশি লেখক ও গবেষক শিকোয়া নাজনীন রচিত নভেরা : শিল্পের রহস্যমানবী গ্রন্থকে কেন্দ্র করে আলোচনা ও গ্যালারি ওয়াকের মাধ্যমে দর্শকরা নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পান এই অসাধারণ শিল্পীকে। জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে গত ৪ জুলাই শুরু হয়ে প্রদর্শনীটি ২১ জুলাই শেষ হয়।
প্রদর্শনী
সময়ের অগ্রদূত নভেরা আহমেদ
দীপ্তি ঘোষ
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম
আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম
ছবি : লেখক। গ্রাফিক্স : দেশ রূপান্তর
×
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
