প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

পর্যটন খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের পর্যটন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়, দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া এবং পুরো বিশ্ব পর্যটনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ। তাই বাংলাদেশের পর্যটনের সমস্যা ও সম্ভাবনা শুধু দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বৈশ্বিক দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

পর্যটনের তিনটি খাতের মধ্যে অভ্যন্তরীণ খাত বাদে, ইনবাউন্ড এবং আউটবাউন্ড দুটি খাতই বহির্বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত। বহির্বিশ্বের সাথে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আলোচনা শুরুর আগে পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার—দেশের অন্যান্য অর্থকরী খাত যেমন শুধু সেই-খাত এবং তার সম্পৃক্ত কিছু খাতের সাথে জড়িত, পর্যটন খাত কিন্তু তেমন নয়। পর্যটন খাত দেশের প্রায় সব খাতের সঙ্গে জড়িত। সে কারণে যদি একটি খাত পিছিয়ে পড়ে বা পর্যটনবান্ধব সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে পর্যটন খাতের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেখানে সড়ক, যোগাযোগ, নৌ, বিমান, প্রশাসন, আইন, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বন, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, ধর্ম, বাণিজ্য, চিকিৎসা, ভেবে দেখুন কোন খাত পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়। সবাই জড়িত। বাড়িতে মেহমান আসার মতো। সবকিছু পরিপাটি, নিখুঁত, গোছানো, সুস্বাদু খবার, সুন্দর হাসিমুখের আচরণ বিদায় বেলা পর্যন্ত অটুট থাকা চাই। তাহলেই তো মেহমান খুশি।

ঠিক একইভাবে অন্য দেশের (বিশেষ করে যেসব দেশের ওপর বাংলাদেশের পর্যটন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল) অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পর্যটনের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই অন্যান্য খাতের মতো পর্যটন খাতও অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। বাংলাদেশ পর্যটনে পিছিয়ে পড়লে তার সুবিধা প্রতিযোগী এবং প্রতিবেশী দেশ পাবে। প্রকৃতপক্ষে, পর্যটন খাত তার চেয়েও সংবেদনশীল। পর্যটন গন্তব্যে গিয়ে যদি পর্যটক রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতিবাচকতার স্বীকার হন, তিনি সেখানে আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না। দুদেশের মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্কের সাথে পর্যটকের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যার মজার দিক হচ্ছে, গত ৫৫ বছর ধরে এ নিয়ে এত চর্চা হয়েছে যে, এখন আর কারও মনে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই—সমস্যাটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক। একটি দেশ যদি তার কৌশল-পরিকল্পনা ও যথাযথ বাস্তবায়ন তালিকায় (বলা হয়, থ্রাস্ট সেক্টর) পর্যটন খাতকে না রাখে, তাহলে ওই খাত কোনোভাবেই এগোতে পারবে না, বেসরকারি খাত যতই শক্তিশালী হোক না কেন। যেহেতু বাংলাদেশের পর্যটন খাত সরকারের সমন্বিত বাস্তবায়নের তালিকায় নেই, তাই শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয় বা শুধু পর্যটন করপোরেশন বা শুধু পর্যটন বোর্ড বা বেসরকারি খাত উল্লেখযোগ্য কিছুই করতে পারবে না। তৈলাক্ত বাঁশে বানরের বেয়ে ওঠার মতো, দুই-পা এগিয়ে তিন-পা পিছিয়ে যায় পর্যটন খাত।

পর্যটন গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণাপত্র মতে, বাংলাদেশের পর্যটন সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ৫টি বিষয় : ১. পলিসি (বাস্তবায়ন নেই), ২. প্রশাসন (নিরাপত্তা ও আইনের প্রয়োগ), ৩. টেকসই অবকাঠামো, ৪. পরিবেশ (সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা), ৫. কৌশলগত বিপণন (স্ট্র্যাটেজিক কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং)।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, ঢাকা থেকে বরগুনা, শ্রীমঙ্গল থেকে খুলনা, সড়ক বা নদী পথে কোথাও একটি মানসম্পন্ন পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট পাওয়া যাবে না, যেখানে একজন বিদেশি পর্যটককে আপনি আত্মবিশ্বাসের সাথে নিয়ে যেতে পারবেন। রাস্তা-ঘাট-বাজারের কথা ছেড়ে দিন।

পরিকল্পনা, গবেষণা, উদ্যোগ ও বাস্তবায়নে আমরা সবচেয়ে পিছিয়ে। বিশ্বে যখন নারীর ক্ষমতায়নে টেকসই পর্যটনের অর্থনৈতিক অবদান নিয়ে গবেষণা চলছে, যখন অঙ্ক কষে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কমিউনিটি বেইজড পর্যটনের প্রভাব নিয়ে গবেষকরা পরিসংখ্যান মডেল বানাচ্ছেন তখন বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সেতু বা ফ্লাইওভার না হয়ে নদীতে ট্রলার আর সড়কে ব্যাটারিচালিত গাড়ি থাকবে কিনা সে নিয়ে বিতর্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অথচ উন্নত পর্যটন গবেষণায় দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে যাদের গবেষণাপত্র বিশ্বসেরা জার্নালে ছাপা হয় তাদের মধ্যে বাংলাদেশি গবেষকদের নামও আছে। বাংলাদেশ পর্যটন মেধাশূন্য নয়। দেশের অন্তত এক কুড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগ আছে। শত শত পর্যটনসম্পৃক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশে অন্তত ১৫ লাখ মানুষ সরাসরি পর্যটন পেশায় এবং ৪৭ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে, মোট ৬২ লাখ মানুষ পর্যটন পেশার সঙ্গে জড়িত। উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবসম্পদ খাত হচ্ছে পর্যটন। ২০২৫ সালে শুধু টেকসই পর্যটন খাতের মার্কেট সাইজ ছিল ৩.৫৬ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৪ সালে ৩ গুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ছোট্ট একটি দেশে গুনে গুনে অন্তত ৪টি আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা প্রতি বছর আয়োজন হয়। সবটাই বেসরকারি খাতের উদ্যোগে।

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার হিসাব মতে, ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে পর্যটন খাত আয় করেছে ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বিশ্ব জিডিপিতে অবদান রেখেছে ১১.৯%। এটা গড়। কোনো কোনো দেশে তাদের পর্যটন খাতের অবদান অনেক বেশি, কোনো কোনো দেশের অবদান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। বাংলাদেশ সেই নিম্নসারির দেশগুলোর একটি, যার জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১ শতাংশের চেয়েও কম। বোঝা কঠিন নয়, যদি পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হতো, সঠিক নেতৃত্ব দেওয়া যেত তাহলে এই খাত দেশের গড় মাথাপিছু আয়বৃদ্ধিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

যখন বিশ্বের সবচেয়ে বিপর্যস্ত পারমাণবিক দুর্ঘটনার সাক্ষী প্রিপেট শহরের ইতিহাস তুলে ধরে ইউক্রেন বছরে লক্ষাধিক পর্যটকের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে (এই যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনের পর্যটন বন্ধ নেই) তখন  বাংলাদেশে একটার পর একটা মুক্তিযুদ্ধের স্বাক্ষর ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি পর্যটন পণ্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসন পর্যটনবান্ধব নয়। কম্বোডিয়ার তুল স্লেং জেনোসাইড মিউজিয়াম, জার্মানিতে হিটলারের বাড়ি, পোল্যান্ডে হিটলারের কুখ্যাত গ্যাস চেম্বার, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পসহ পৃথিবীর আরও বহু ঐতিহাসিক স্থান পর্যটনের অনন্য সম্পদ হয়ে এখনো টিকে আছে। কারণ সেগুলোকে তারা পর্যটন সম্পদে রূপান্তরিত করতে পেরেছে। সিঙ্গাপুরের সুলতান মসজিদের চেয়ে অনেক আশ্চর্য স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ বাংলাদেশে আছে। সিঙ্গাপুর জানে পর্যটন পণ্যের উন্নয়ন কীভাবে ঘটাতে হয়, তারা পেরেছে। বাংলাদেশও জানে কিন্তু করেনি আর যা করা হয়েছিল তাও রক্ষা করেনি।

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এই সবুজ বাংলাদেশ হতে পারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্য। কারণ আমাদের আছে এক শক্তিশালী পর্যটন উপাদান—আতিথেয়তা। ভ্রমণ শেষে চলে যাওয়ার আগে অগণিত বিশ্বপর্যটকরা দ্বিধাহীনভাবে বলে গেছেন—এমন আপ্যায়ন, এমন ভালোবাসা, এমন প্রাণভরা আতিথেয়তা তারা দুনিয়ায় আর কোথাও পাননি। এ দেশের মানুষ অতিথিদের সত্যিকারভাবে হৃদয় উজাড় করে আপ্যায়ন করতে জানেন। পর্যটনের জন্য বহু উপাদান দরকার হয় কিন্তু ধরে নেওয়া হয়, পর্যটককে সেবা দেওয়া, তাকে আতিথেয়তা দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের একটি—যা বাংলাদেশিদের মজ্জাগত।

শুধু কি তাই এদেশের আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ একটানা (আনব্রোকেন) সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, নীল জলের দ্বীপ সেন্টমার্টিন, হাওর ও চা-বাগানের সিলেট, পাহাড়-বন-লেকের রাঙামাটি পার্বত্য-চট্টগ্রাম, নদীমাতৃক অঞ্চল ও অভয়ারণ্য।

ভৌগোলিক এই ঐশ্বর্যের পাশাপাশি আমাদের আছে হাজার বছরে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং আমাদের নিজস্ব রীতি-নীতি-প্রথা, যা পর্যটনের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও দেশের উত্তরাঞ্চল এই সম্পদে পরিপূর্ণ।

পর্যটন খাতের বিভিন্নতার দিক থেকে বাংলাদেশে এগিয়ে আছে ছয়টি খাতে : কৃষি, গ্রাম, নদী, অরণ্য, সংস্কৃতি এবং অ্যাডভেঞ্চার। সবগুলোই বিশেষায়িত পর্যটন খাত। হলিডে ট্যুর, হানিমুন ট্যুর, ক্রীড়া-উৎসব-ধর্মসহ পর্যটনের আরও যত চমকপ্রদ অর্থকরী খাত রয়েছে বাংলাদেশ সেসবের জন্য ততটা উপযোগী নয়।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা হাতির সাথে তুলনা করা চলে। শক্তিমান একটি উন্নয়নশীল খাত যাকে ব্যবহার করে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, সারা দুনিয়ার অধিকাংশ দেশ তরতর করে অর্থনৈতিক উন্নতির পর্বত বেয়ে ওপরে উঠে গেছে, বাংলাদেশ সেখানে এঁদো কাদা-জলে বিধ্বস্ত এবং ঝড়-ঝাপটায় বিপর্যস্ত। স্বাধীনতাপরবর্তী অর্ধশতাব্দীতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন খাত হাঁটি হাঁটি পা পা করে যেখানে পৌঁছেছে তার অধিকাংশ কৃতিত্বই বেসরকারি খাতের। ফলে সরকারের করুণার দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের পর্যটনের আগামী দিনের সম্ভাবনার বাতি জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব বেসকরারি খাতেরই।

লেখক : পিএইচডি স্কলার, নোভা ইউনিভার্সিটি অব লিসবন, পর্তুগাল