প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

বাংলাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্ব ও প্রতিবেশী সমাচার

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম

বাংলার একটা অসাধারণ ভৌগোলিক গুরুত্ব প্রাচীন আমল থেকেই খেয়াল করেছেন বণিকরা। টমে পিরেস নামের একজন পর্তুগিজ প্রশাসক ১৫১৫ সালে আলাউদ্দীন হুসেন শাহর শাসনামলে প্রতিবেশীদের ওপর বাংলার প্রভাব বিষয়ে লিখেছেন যে, দক্ষিণ-পশ্চিমে উড়িষ্যা, দক্ষিণ-পূর্বে আরাকান এবং পূর্বে ত্রিপুরা তার করদ রাজ্য, তিনি দখল করেছেন কুচবিচার আর কামরূপ। কিন্তু এসব সম্ভব হয়েছিল কীভাবে? সে সম্পর্কে ধারণা মিলবে তার একটা মন্তব্যে—‘বাংলার মূল্যবান দ্রব্যাদি এসব রাজ্যে নির্মিত হয় আর সমুদ্র ছাড়া টেকা সম্ভব নয় বলে বাংলার সুলতানকে তারা মান্য করে চলে।’

ভূগোলের এই ভূমিকা প্রাচীনকালের মতোই বর্তমানেও এক একটা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামরিক, পররাষ্ট্রনীতিগত কৌশল নির্মাণে নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে। ভূগোলের সুবিধাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে একটা দেশ যেমন সিঙ্গাপুরের মতো নিজেকে বিকশিত করতে সক্ষম হতে পারে, আবার পানামার মতোই স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রিত একটা রাষ্ট্রেও পরিণত হতে পারে। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকটে ইরান যেমন হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করছে তার কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে, ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী সুয়েজ খালের অবস্থানের কারণে মিসরের ভবিতব্য যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে সামরিক বাহিনী দ্বারা শাসন, যাতে দেশটি ফিলিস্তিন প্রশ্নে কোনো ভূমিকা যেন নিতে না পারে। ইউরোপ আর এশিয়ার মধ্যবর্তী সরু পানিপথের অধিকারী হওয়ার কারণে তুরস্কেরও একই অবস্থা হতে পারত, দেশটি রক্ষা পেয়েছিল অন্য ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে, অনেকখানি কামাল আতাতুর্কের প্রতিরোধের কল্যাণেও।

একেকটা ভৌগোলিক বাস্তবতা কখনো কখনো রাজনীতি বা ইতিহাসের ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে দেশের ভেতরেও নানান আকাঙ্ক্ষা, উন্মাদনা এবং অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশে যেমন, কিছু মানুষের মাথার ভেতরে সেভেন সিস্টার্স দখল করার বাসনা বন্ধ হওয়ার নয়। অন্য কিছু মানুষ বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার সালতানাতেরও স্বপ্ন দেখেন। এই ভাবনাগুলো কোনোটা রসদ পেয়েছে সুলতানি ও নবাবি আমলের ইতিহাস থেকে, কোনোটা আশ্বাস পেয়েছে ভারতের কিছু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কমবেশি জারি থাকার ধারাবাহিকতা থেকে। এগুলোর মাঝে অস্থির হওয়ার উপাদান আছে, সত্যি। কিন্তু সেগুলো বাস্তব ক্ষেত্রে কতটুকু যৌক্তিক ও কার্যকর, সেটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এমনকি, বাংলাদেশের জন্য শেষ বিচারে কোনটি লাভজনক, সেই বিবেচনাও জরুরি।

ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশের ওপর তার প্রতিবেশী অনেকগুলো অঞ্চল নির্ভরশীল। এই অঞ্চলগুলো ব্রিটিশ আমলের আগে ভারতীয় রাষ্ট্রের অংশ ছিল না এটা সত্যি, কিন্তু এও সত্যি যে, গত ৭০ বছরের বেশি সময়ের চর্চার মধ্য দিয়ে অঞ্চলগুলো ভারতীয় রাষ্ট্র, তার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মাঝে অনেকটাই আত্মীকৃত হয়েছে। জাতীয়তাবাদ একটা কাল্পনিক সংহতির বিষয়, অনেকগুলো জাতির এক একটি যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে ভারত কিংবা মিয়ানমার ততখানি সফল; যতখানি তারা স্থানীয় পর্যায়ের মধ্যবিত্ত এবং অন্যান্য শ্রেণিগুলোর স্বার্থকে নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

সব রাষ্ট্রের নাগরিকরাই নিজেদের রাষ্ট্রকে পবিত্র মনে করেন, মনে করেন তার অস্তিত্ব ও অখণ্ডতা অলঙ্ঘনীয়। এতে দোষণীয় কিছু নেই, কেননা এই মনে করা থেকে রাষ্ট্রগুলো শক্তি পায়, তার অভ্যন্তরীণ সংহতির বোধ তৈরি হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই শক্তি ও সংহতির জায়গাটি ভাবাদর্শগত, অর্থাৎ রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল।

এই রাজনৈতিক বাস্তবতা কখনো কখনো ভূগোলের বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়। ভূগোল বলছে পাকিস্তান ও ভারত বন্ধু হলে, মধ্য এশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি করার পথ উন্মুক্ত হলে দুটো দেশের অর্থনীতিই বিপুলভাবে লাভবান হবে, ওই অঞ্চল পরিণত হবে বিনিয়োগ, উৎপাদন, যাতায়াত ও সস্তা পণ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজনীতির স্বার্থ বলছে ভিন্ন কথা।

দুই.
ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশকে রাজনীতির বাস্তবতা ছাপিয়ে কিছু অনন্য ভূমিকা রাখার ও কেন্দ্র হিসেবে থাকার মতো সুযোগ তৈরি করেছে। আমাদের প্রতিবেশী অঞ্চলগুলো হতেই পারে দুটো ভিন্ন দেশের অংশ, কিন্তু সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ, জলীয় সম্পদ, খনিজ সম্পদ, এমনকি জনসম্পদও বাংলাদেশের কাজে আসতে পারে, যদি বাংলাদেশ নিজেকে যথাযথ একটা পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বিকশিত করতে সক্ষম হয়। শুরুতে পিরেসের যে উদ্ধৃতিটা দেওয়া হয়েছে, তার মতো করেই বলা যায় : বাংলার প্রতিবেশীরা এখনো বহু ধরনের সম্পদ ও সম্ভাবনার অধিকারী, কিন্তু বাংলা তাদের সবার জন্য যোগাযোগের নাভিবিন্দু।

বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকেরই ভয় সামরিক আগ্রাসনের। এই সম্ভাবনা আদতে খুবই কম। এর বহু কারণ আছে। আপাতত দুটো কারণ বলা যাক। একটা হলো জনগণের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা কাশ্মীরের চাইতেও বহুগুণ কঠোর হবে। অন্য কারণটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার দিকে আরেকবার যদি তাকাই, এই অঞ্চলের প্রধান দুটি শক্তি চীন ও ভারতের রাজনৈতিক রেষারেষি এবং পরস্পরের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টাকে নাকচ করার প্রবণতাই বাংলাদেশের জন্য একটা বড় নিশ্চয়তা। বাংলাদেশের বাস্তবতাকে আদৌ যারা বোঝেন না, তারা নিয়মিতই বাংলাদেশের সিকিম হওয়ার দুঃস্বপ্ন দেখতে বা দেখাতে থাকেন।

বাংলাদেশে অন্য ধরনের একটা দখলদারিত্ব ছিল, সেটা রাজনৈতিক প্রভুত্বের। মুক্তিযুদ্ধ একদিকে যেমন এই ভূখণ্ডের মানুষকে একটা মুক্তি ও আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষায় বলীয়ান করেছে, একইভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী ও সংস্কৃতি জগতে একটা প্রভাবশালী অংশ তৈরি করেছিল, যারা তাদের অস্তিত্ব ও স্বার্থকে ভারতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত করে দেখেছেন, বাংলাদেশকে তাদের স্বার্থের অনুগত হিসেবে প্রাণপণে তৈরি করেছেন।

এই হীনতার বিরুদ্ধে জনগণের ক্রোধ বরাবরই ছিল এবং বলা যায়, তরুণ প্রজন্মের মধ্য দিয়ে সেই আত্মমর্যাদার দাবির বিস্ফোরণ ঘটেছে চব্বিশে। এই অর্থে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আদতে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একটা রাষ্ট্রের দাবিরই নতুনতর প্রকাশ।

তিন.
ভূগোলের সুবিধা বাংলাদেশ নিতে পারেনি অনেক কারণে। বাংলাদেশের প্রতিবেশীরা বহু ক্ষেত্রেই সন্দেহ ও ঈর্ষা নিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকান। আরাকানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যাই হোক না কেন, ভৌগোলিকভাবে তা বাংলার সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত যে, তারা তাদের উৎপাদিত ধান কিংবা মাছের দাম এই ঢাকাতেই ভালো পাবে। আসামে উৎপাদিত ডিজেল ভারতেরই অন্য কোনো জায়গায় নেওয়ার চাইতে বাংলাদেশের কাছে বিক্রি লাভজনক। ওই এলাকাগুলোর সিংহভাগের ক্ষেত্রে ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে পরিবহন এত কঠিন যে, বাংলাদেশ থেকে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী কেনা তাদের জন্য মহাস্বস্তির হতে পারে। বাংলাদেশের বনজ সম্পদ এত সীমিত যে বনে হাত দেওয়াকেই অপরাধতুল্য করে আইন প্রণয়ন দরকার। পরিবেশ রক্ষা করে সেই চাহিদা মেটাতে পারে প্রতিবেশীরা। আঞ্চলিকভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে এসব অঞ্চলে বহু রকমের লেনদেন, বিনিয়োগ আর যাতায়াত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বাংলাদেশের সস্তা পণ্যের চাহিদা মেটাতে পারে, চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে রপ্তানি হতে পারে।

এসব সম্ভাবনার সামান্য অংশই আসলে বর্তমান বাস্তবতায় বাস্তবায়নযোগ্য।

চার.
পিরেস যখন লিখছিলেন, ১৫১৫ সালের সুলতানি আমলের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য হলো এই যে বাংলা তখন এই অঞ্চলে নির্ধারক শক্তি ছিল। দিল্লির আগ্রাসন তারা সাফল্যের সঙ্গে কয়েক শতাব্দী প্রতিহত করেছিল আর আঞ্চলিক সব শক্তি ছিল তাদের মুখাপেক্ষী কিংবা হীনবল। কিন্তু এখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বৃহৎ ভারত রাষ্ট্র উপস্থিত, ভূগোলের সেই সুবিধা এখন রাজনীতির সাপেক্ষেই কেবল কার্যকর হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে অবশ্য ভারত রাষ্ট্রের ভূমিকাই মুখ্য। অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে তার ভূমিকা ইতিবাচক হলে স্বাতন্ত্র্য ও আত্মমর্যাদা সহকারেই তার প্রতিবেশীরা তার সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক নির্মাণ করতে পারত। কিন্তু সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া, সীমান্ত হত্যা, পানি প্রত্যাহার ইত্যাদি বস্তুগত শত্রুতা শুধু নয়, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টার মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ধ্বংস করেছে। সেই রাজনীতির ইন্ধনে বাংলাদেশেও কোনো কোনো রাজনৈতিক শক্তি সাড়া দিয়েছে, সার্বিকভাবেই একটা শত্রুতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে, এই ক্ষেত্রে ভারতই নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে।

ভূগোলের স্বাভাবিক প্রবাহে যে যোগাযোগ, যে বিনিয়োগ, যে চলাচল এবং উৎপাদন হতে পারত আঞ্চলিক ভিত্তিতে, তা না হওয়ার ফল এই অঞ্চলের সবাই যৌথভাবে ভোগ করছে। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে প্রায়ই যে আগুন জ্বলছে, বহুক্ষেত্রেই তার সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো ইন্ধনের সম্পর্ক নেই। আছে সেখানকার বেকারত্বের, বিনিয়োগহীনতার, চলাচলের অভাবের, সুযোগের অভাবের। এটাও ঠিক যে, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আরাকান কিংবা আসাম যেকোনো অঞ্চলের বিকাশ নিয়ে তাদের কেন্দ্রগুলো অস্বস্তিতে ভুগবে। অন্যদিকে এটাও তো ঠিক যে, এই অঞ্চলগুলোর আনুপাতিক দারিদ্র্য ও বিকাশহীনতা জায়গাগুলোকে ক্রমাগত উচ্চ থেকে উচ্চহারে ষড়যন্ত্র আর বাইরের হস্তক্ষেপের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করছে।

পানি যেমন নিম্নমুখে ধাবিত হয় বলেই তাকে ঠেকিয়ে রাখতে বিপুল শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করতে হয়, ভূগোলের এই স্বাভাবিক সংযোগগুলোকে প্রতিহত করতে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো এভাবে বিপুল সম্পদ ব্যয় কিংবা অপচয় করছে। মনিপুরে যে আগুন আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা আদতে বহুমুখী এই ভৌগোলিক বাস্তবতারই পরিণাম।

লেখক : গবেষক ও রাজনীতিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত