উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দুই পক্ষের আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। গতকাল রবিবার ভারত সফরে থাকা অবস্থায় এক সংবাদ সম্মেলনে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিয়ে একটি বড় ঘোষণা আসতে পারে। রুবিও এই ঘোষণাকে বিশ্বের জন্য একটি ‘ভালো খবর’ বলে উল্লেখ করে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর আগে গত শনিবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে সমঝোতা ‘প্রায় চূড়ান্ত’। এ চুক্তির মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও, বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। ট্রাম্পের এ বক্তব্যের আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান অনেকটাই কাছাকাছি এসেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর অর্থ এ নয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমঝোতা হয়ে গেছে।
যুদ্ধ বন্ধের এই চুক্তি হলে তাতে কী কী বিষয় থাকতে পারে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। তাতে বলা হয়, এই চুক্তির আওতায় চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হতে পারে। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগাম টানার বিষয়ে আলোচনা চলমান থাকবে। সমঝোতা স্মারকের আওতায় ওই ৬০ দিনের মেয়াদে হরমুজ প্রণালি কোনো শুল্ক ছাড়াই উন্মুক্ত থাকবে। এছাড়া জাহাজ চলাচল অবাধ করতে এই প্রণালিতে বসানো সব মাইন সরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে ইরান। পাশাপাশি দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৬০ দিন পরও বাড়ানো যেতে পারে বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এর বিনিময়ে প্রস্তাবিত চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানকে অবাধে তেল বিক্রির অনুমতি দিতে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, খসড়া চুক্তিতে ইরানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত করার বিষয়ে আলোচনা করবে এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নেবে। এই সমঝোতা স্মারকে এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের অবসান ঘটবে। তবে হিজবুল্লাহ যদি কোনো উসকানি দেয় বা হামলা চালায়, তবে ইসরায়েল তাদের ওপর পাল্টা আঘাত করার অনুমতি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন হিজবুল্লাহ যদি শান্ত থাকে, তবে ইসরায়েলও শান্ত থাকবে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনা রয়েছে, তবে ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বেশ কিছু বিষয়ে তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ চুক্তির দুটি বিষয় নিয়ে তিনি দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। গতকাল রবিবার টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ও লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে নেতানিয়াহু আপত্তি জানিয়েছেন।
এদিকে, সমঝোতা আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে এমন সম্ভাবনার জন্যও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতি তীব্র অবিশ্বাস থাকায় ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য প্রস্তুত তেহরান। সামরিক একটি সূত্র সম্প্রতি তাসনিমকে বলেছে, যদি ওয়াশিংটন আবারও ভুল হিসাব করে আর ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয় তাহলে তারা ইরানের সঙ্গে ‘সংঘাতের তৃতীয় সংস্করণের’ মুখোমুখি হবে যা কৌশল, রণনীতি, উদ্দেশ্য ও সরঞ্জামগত দিক থেকে পূর্ববর্তী দুটি যুদ্ধ থেকে আলাদা হবে।