ব্যর্থতা দেখছে বিরোধী দল

প্রথম ১০০ দিনে সরকারের ব্যর্থতা এবং সদিচ্ছার অভাব দেখছেন বিরোধী দলগুলোর নেতারা। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনীহা, মৌলিক সংস্কার পাশা কাটিয়ে যাওয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আর্থিক খাতে অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ জ¦ালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন তারা।

জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ সরকারের বাইরে থাকা দলের নেতারা বলেছেন সরকারের আচরণে মনে হচ্ছে, তারা আগের ফ্যাসিবাদী কাঠামোতেই থাকতে চায়। এ জন্য নির্বাচনের আগে দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতি তারা ভুলে গিয়ে জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।

এরই মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে মাঠের কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধীদলীয় জোট। তবে এখনই সরকারের পদত্যাগ বা পতন চায় না তারা । সরকার তার অবস্থান পরিবর্তন না করলে জনগণ আবার রাস্তায় নেমে আসবে বলে মনে করছেন বিরোধীদলীয় নেতারা।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, মানুষ বিপুল আশা নিয়ে নতুন সরকার ও সংসদ গঠনের দিকে তাকিয়ে ছিল, সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সেই আশায় ভাটা পড়েছে। সরকার জনগণের ভাষা ও আকাক্সক্ষা অনুধাবন না করে উল্টো জনমতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্র-যুবকরা জীবন দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে ও দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। কিন্তু সেই ছাত্র-জনতার গণআকাক্সক্ষাকে ক্ষমতায় বসেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলে সেখানে দলীয়করণ হবে, আর জনগণ এর সুফল পাবে না।

তিনি মনে করেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় যে সংবিধান তৈরি হয়েছিল, বিএনপি সেই সংবিধান রক্ষার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এর আওতায় সাংবিধানিক পথসমূহ জুলুমের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।’

‘আমরা এখনই সরকারের পদত্যাগ চাই না’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ৫ বছর দায়িত্ব পালন করুক এবং জনরায় আমলে নিয়ে সংবিধান সংশোধন করুক। কিন্তু বিএনপি তার অবস্থান পরিবর্তন না করলে জনগণ আবার রাস্তায় নেমে আসবে।’

জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের ১০০ দিন হয়ে গেল, এখনো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেনি এটি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। গুম কমিশন, মানবাধিকার কমিশন বাতিল করল। তখন তারা বলেছিল, এর চেয়ে শক্তিশালী আইন করবে। কিন্তু ১০০ দিনেও তা করতে না পারা, তাদের আরও বড় ব্যর্থতা। বিচারবিভাগের পৃথক সচিবালয় বিলুপ্ত করেছে এটি শুধু ব্যর্থতাই নয়, জনগণের পিঠে ছুরিকাঘাত।

ব্যারিস্টার আরমান আরও বলেন, এই সরকারের কাঠামোর মধ্যে আমরা কোনো পুনর্গঠন দেখতে পাইনি। আইনশৃঙ্খলাসহ সরকারের নানা অব্যবস্থাপনায় ১০০ দিনেই মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে। এখনো সময় আছে, সরকার যদি আগামী সংসদ অধিবেশনে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে তাহলে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসবে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই সরকার প্রথম ১০০ দিনেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বিএনপি নির্বাচনের আগে মানুষকে যে কথা দিয়েছিল, সরকারে এসে সেই কথা ভুলে গেছে। সরকার ব্যাংক লুটপাট বন্ধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ইসলামী ভাবধারার ব্যাংকগুলো আওয়ামী লীগ সরকার শেষ করে দিয়ে গেছে। মানুষের প্রত্যাশা ছিল এই সরকার লুটেরাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। কিন্তু আমরা সরকারের আচরণে শঙ্কিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে ডাকসু ভিপিসহ প্রতিনিধিরা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তখন তিনি সবাইকে মিলেমিশে ক্যাম্পাসে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু আমরা দেখলাম একটা ভুয়া ফটোকার্ডকে কেন্দ্র করে ডাকসু নেতাদের ওপর হামলা হলো। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্রশিবিরের একটা ছেলের পায়ের গোড়ালি কেটে দেওয়া হলো। বিবি সওদা নামের এক নারীকে ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করার কারণে গ্রেপ্তার করা হলো। এগুলো তো সুশাসনের লক্ষণ নয়।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে অনেক সংকট, অনেক সমস্যা আছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সংকট চলছে। এগুলো সমাধানে হয়তো সরকারকে আরও সময় দিতে বলবেন অনেকেই। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা ছিল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার হবে। দুর্নীতি দমন কমিশিন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, গুম ও মানবাধিকারের মতো বিষয় নিয়ে সরকারের অবস্থান মানুষের মনে সন্দেহ উদ্বেগ তৈরি করে।

তিনি বলেন, আমাদের মনে হচ্ছে, সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের সরকরের মতোই অপব্যবহার করতে চায়। যে কারণে তারা এসব বিষয় পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। যেসব বিষয় সরকারকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করবে, তা তারা বাস্তবায়ন করছে না।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য এবং ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহ উদ্দিন আইউবী বলেন, সরকার সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেগুলো লোকদেখানোর মতো শুরু করা হলেও কোনোটাই যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। এগুলোতে মানুষ উপকৃত হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, সরকার তাদের ১০০ দিনেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। শেষ ১০ দিনে অন্তত ছয় শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মিরপুরের রামিসার হত্যাকারী ছাড়া আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। একই পরিবারের পাঁচজনকে একসঙ্গে খুন করা হলেও এখনো অপরাধীকে ধরতে পারেনি। পুলিশকে ঢেলে সাজাতে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সাইফুল্লাহ হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের ১০০ দিন পার করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা থাকলেও তারা তা বাস্তবায়ন করেনি। তারা গণভোটের গণরায়কে অবজ্ঞা করেছে। ফ্যামেলি কার্ড দেওয়া শুরু করলেও আগে থেকে চালু থাকা প্রতিবন্ধী কার্ডসহ নানা সামাজিক সুরক্ষা সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মার্কেটিংয়ের শিক্ষককে। সব প্রতিষ্ঠানে দলীকরণের নিকৃষ্ট নজির এই ১০০ দিনের মধ্যেই স্থাপন করল সরকার।

এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, সরকার একদিকে উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধী দল দমন করছে। মন্ত্রী, এমপি বা হুইপের নামে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কারও সমালোচনা করলেই আগের কায়দায় তুলে নেওয়া হচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির নেতা এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশও আগের ফ্যাসিবাদীদের মতো দলীয় লেজুড়বৃত্তি শুরু করেছে।