বাসযাত্রায় আছে গাড়ির চাপ ও যানজট

আগামী পরশু ঈদ। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে গতকাল সোমবার থেকে। রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোর পোশাক কারখানায়ও গতকাল থেকে ধাপে ধাপে ছুটি শুরু হয়েছে। ফলে মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে গাড়ির চাপ এবং যানজটও। এর মধ্যে বৃষ্টির কারণে মানুষ পড়েছেন সীমাহীন দুর্ভোগে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিভিন্ন বাসে অতিরিক্ত ভাড়া। এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অস্থিরতা ও হতাশা থাকলেও বাড়ি ফেরার আনন্দের কাছে তা ছিল সাময়িক। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বাসস্ট্যান্ড ঘুরে এমন চিত্রই চোখে পড়েছে।

যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা : গতকাল দুপুর ১২টায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায় মানুষে গিজগিজ করছিল। দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী এলাকার সড়কের বাম পাশে দোলাইরপাড়মুখী সারি সারি বাস কাউন্টার। পদ্মা সেতু হয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ২০টি জেলার বাস চলে এই রুটে। একটু পরেই শুরু হয় মুষলধারায় বৃষ্টি। এ পরিস্থিতিতে নারী ও শিশুদের দুর্দশা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিদিন এই রুটে শত শত বাস চলাচল করলেও নেই কোনো যাত্রী ছাউনি। ফলে ব্যাগ, লাগেজসহ যাত্রীদের ভিজতে হয়েছে।

তুমুল বৃষ্টির মধ্যে অনেকেই আশ্রয় নেন পাশেই যাত্রাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির বারান্দায়। সেখানে কথা হয় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী দুই বন্ধুর সঙ্গে। ঈদের ছুটিতে যাচ্ছেন বরিশালে। তারা অভিযোগ করেন, ‘এমনিতে ৫০০ টাকা ভাড়া। কিন্তু এখন কোনো পরিবহনই ৭০০ টাকার নিচে নেবে না।’ তাদের কথার সত্যতা মেলে খুলনা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রী ও পরিবহন-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে। বৃষ্টিতে ফুটপাতের ফলের দোকানে ছাতার নিচে আশ্রয় নেন তৌহিদুল ইসলাম (৩০)। রূপসী বরপা এলাকার একটি প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করেন। যাবেন বরিশালের বাকেরগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে। তিনি বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে বখশিশ ও বোনাস যা পেয়েছি তা বোধহয় গাড়িতেই দিয়ে যেতে হবে।’ পাশেই বৃষ্টিতে জবুথবু হয়ে রাগে গজ গজ করছিলেন সেন্টু কাজী (২৮) নামের একজন। ঢাকায় তিনি ট্রাক চালান। যাবেন মাদারীপুরে গ্রামের বাড়িতে। তিনি জানান, ৩০০-৩৫০ টাকার ভাড়া একলাফে দ্বিগুণ চাইছে বাসগুলো। ওই জেলার একাধিক বাস কাউন্টারে কথা বলে অবশ্য এ অভিযোগে সত্যতা মেলে। ‘সিয়াম’ পরিবহনের সুপারভাইজার সুজন মিয়া বলেন, এমনিতে মাদারীপুরের ভাড়া ৪০০ টাকা থাকলেও, বৃষ্টিতে যাত্রী কমেছে। ফিরতি পথে বাস খালি আসছে। সেজন্য তারা কিছুটা বাড়তি নিচ্ছেন। খুলনাগামী ‘গ্রামীণ পরিবহন’র সুপারভাইজার আমির হোসেন বলেন, ‘ফিরতি পথে গাড়ি খালি আসছে। আর ঈদ এলে যাত্রীরা খুশি হয়েই কিছু বাড়তি দেয়।’

সায়েদাবাদ : দুপুর পৌনে ২টার দিকে সায়েদাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় যাত্রাবাড়ী এলাকার বিপরীত চিত্র। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে ভিজে যে কজন যাত্রী আসছিলেন তাদের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন চালক, কন্ডাক্টর ও চালকের সহকারীরা। এই টার্মিনাল থেকে সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ, চাঁদপুর, মৌলভীবাজারসহ বেশ কিছু জেলার উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। কুমিল্লাগামী ‘তিশা’ পরিবহনের সুপারভাইজার ওমর ফারুক হাঁক ছেড়ে টিকিট বিক্রির চেষ্টা করছেন। কিন্তু যাত্রী কম থাকায় হতাশ গলায় তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে ৫০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন তারা। কুমিল্লাগামী বাস কাউন্টারের অদূরে মৌলভীবাজারগামী ‘তাজ’ পরিবহনের সুপারভাইজার মামুন মিয়া বলেন, যাত্রীর চাপ নেই বললেই চলে। এই রুটের বেশিরভাগ মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করে। তবে, ঈদের আগের দিন (বুধবার) যাত্রীর চাপ বাড়বে বলে আশা করেন তিনি। পাশেই হবিগঞ্জগামী ‘অনিক’ পরিবহনের সুপারভাইজার বাবুল মিয়া বলেন, সকালের দিকে কিছু যাত্রী হলেও প্রায় সারা দিন যাত্রী মিলছে না। তবে, কাল (মঙ্গলবার) থেকে যাত্রী বাড়তে পারে।

এদিকে রাজধানীর গুলিস্তান, দোলাইরপাড়, আরামবাগ বাস কাউন্টার থেকে যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির বাস গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে।

গাবতলী : সরেজমিন গতকাল গাবতলী বাস টার্মিনালে চিরচেনা ভিড় থেকে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সকাল থেকেই বিভিন্ন গন্তব্যের ঘরমুখী মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন টার্মিনালে। কোনো কোনো কাউন্টারের সামনে আসন খালি নেই লেখাসংবলিত প্ল্যাকার্ড ঝুলানো থাকলেও বেশিরভাগ গাড়িতেই তাৎক্ষণিক টিকিট ও ফাঁকা আসন মিলছে। ফলে বড় ধরনের হয়রানি ছাড়াই টিকিট কেটে গন্তব্যে রওনা হতে পারছেন যাত্রীরা। দূরপাল্লার বাসগুলো একের পর এক গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে।

গোল্ডেন লাইন পরিবহনের ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৫টির মতো গাড়ি ছাড়া হয়েছে। অধিকাংশ বাস যাত্রীতে পূর্ণ ছিল। টার্মিনাল থেকে আরও গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সেগুলোতেও অগ্রিম টিকিট দেওয়া হয়েছে। যাত্রী আসা মাত্র ছেড়ে যাবে।’ 

ঝিনাইদহের শৈলকুপার যাত্রী সাংবাদিক তৌহিদুজ্জামান তন্ময় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাড়ির টিকিট নিয়েছি। রাতেই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হব।’ অন্যদিনের তুলনায় যাত্রীর চাপ বেশি। তবে বৃষ্টি, রাস্তায় পশুর হাট বসায় যানজটের আশঙ্কায় তাকে চিন্তিত দেখা যায়। 

এসবি সুপার ডিলাক্স গাড়ির কাউন্টার মাস্টার আলাল বলেন, ‘কোনো গাড়িতে সিট ফাঁকা ছিল না। সবাই এসে বারবার জিজ্ঞাসা করছে। কতজনকে বলে বলে ফেরত পাঠানো যায় বলেন? এ কারণে সামনে লিখে টাঙিয়ে দিয়েছি। তবে আগামীকালের (মঙ্গলবার) গাড়িতে আসন ফাঁকা আছে।’

মেহেরপুরের গাংনীর যাত্রী আরাফাত রিপন জানান, তিনি সাধারণত জেআর পরিবহনে যাতায়াত করেন। ঈদ উপলক্ষে একশ টাকা বেশি নিয়ে ৭৫০ টাকা ভাড়া নিয়েছে তার কাছ থেকে। তবে, কাউন্টারে আসার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত তিনি।

চুয়াডাঙ্গার ‘ডিলাক্স’ পরিবহনের যাত্রী মোহাম্মদ শেখ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘ঈদের হিসেবে যাত্রীর চাপ নেই। কাউন্টারে এসে টিকিট পেয়েছি, তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। আশা করছি ভালোভাবে যেতে পারব। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় কাউন্টার থাকার কারণে এখন গাবতলীতে যাত্রীর চাপ কম।’

টার্মিনালের পরিস্থিতি নিয়ে ‘ঈগল পরিবহন’ কাউন্টার মাস্টার মোহাম্মদ আলী  জানান, গাবতলী থেকে এদিন যে গাড়িগুলো ছাড়ছে, সেগুলোর প্রায় সবই পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে যে গাড়িগুলো টার্মিনাল ছেড়ে গেছে তাদের সতর্কতার সঙ্গে রেগুলার গতিতে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছি।’

গাজীপুর : আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কারখানার মধ্যে দুই হাজারের বেশি তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। গতকাল জেলা ও মহানগরের প্রায় ৪৫ শতাংশ পোশাক কারখানায় ছুটি হয়েছে। আজ মঙ্গলবার আরও ৪৭ শতাংশ এবং কাল বুধবার বাকি শতাংশ কারখানায় ছুটি হবে। তাই  মহাসড়কে বেড়েছে ঘরমুখী কর্মজীবী মানুষের ভিড়। তারা বাস, ট্রাক, ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহনে গ্রামে ফিরছেন। সকাল থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ বেড়েছে। বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার আশঙ্কায় ছুটি পেয়েই রবিবার রাত থেকে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বহু মানুষ।  ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ ও পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, বোর্ড বাজার, গাজীপুরা, টঙ্গীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে গাড়ির ধীরগতি দেখা গেছে। এ ছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে ছিল গাড়ির ধীরগতি।

চান্দনা চৌরাস্তা এলাকা থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়া পোশাকশ্রমিক লাইলী আক্তার বলেন, ‘বাসে উঠতে কিছুটা ভোগান্তি হলেও রাস্তায় বড় কোনো যানজট নেই। আশা করছি স্বস্তিতে বাড়ি পৌঁছাতে পারব।’ বোর্ড বাজার থেকে ময়মনসিংহগামী যাত্রী আসাদ মিয়া বলেন, ‘পরিবহনগুলো ভাড়া কিছুটা বেশি নিচ্ছে। তারপরও সময়মতো বাস পাওয়া যাচ্ছে।’

গাজীপুর মহানগরীর বাইপাস ভোগড়া পেয়ারাবাগান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীবাহী বাস সড়কের দুই পাশে যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসস্ট্যান্ডগুলোতে যাত্রীদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলকারী একটি দূরপাল্লার বাসের চালক রবিউল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে যাত্রী বাড়ছে। মহাসড়কে গাড়ির চাপও বেশি। বাসস্ট্যান্ডগুলোয় ভিড় থাকলেও অন্য এলাকায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক।

গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র গাজীপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক জালাল হাওলাদার বলেন, জেলার অধিকাংশ কারখানাই শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করেছে। ধাপে ধাপে ছুটি হওয়ায় শ্রমিকরা স্বস্তিতে গ্রামের বাড়ি ফিরতে পারবেন।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের এসপি মো. আমজাদ হোসেন বলেন, তিন ধাপে কারখানাগুলো ছুটি হওয়ায় মহাসড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে না বলে আমরা আশা করছি। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যাতে মানুষ স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারে।

পাটুরিয়া-আরিচা ঘাট : শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে গতকাল দুপুরে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাট পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান। এ সময় তিনি যাত্রীদের কাছ থেকে ফেরি ও লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পান। অভিযোগের সত্যতায় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী জরিমানা করার নির্দেশ দেন।

প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা দেখেছি কিছু কিছু জায়গায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগ অভিযোগরে সত্যতা পেয়ে জরিমানার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো কোনো ক্রটিও আমাদের নজর এড়ানোর কথা না।

তিনি বলেন, যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে এরপর বাস ফেরিতে তোলার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করা আমাদের জন্য কঠিন ছিল। আগে যাত্রীরা বাস থেকে নামতে চাইতেন না। বিশেষ করে অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের কিছুটা ভোগান্তি হলেও সার্বিকভাবে মানুষ সরকারকে সহযোগিতা করছে। ঈদের ছুটির পরদিন ঘাটগুলোতে যে পরিমাণ চাপ থাকার কথা, সেই তুলনায় এখানে খুব সুন্দর ও নির্বিঘœভাবে সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে।