ঈদে ফ্রান্স প্রবাসীদের দেশে ফেরার স্বপ্ন থমকে গেছে

প্যারিস থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার। আকাশছোঁয়া বিমানভাড়ার কারণে এবার এই দূরত্ব যেন আরও বেড়েছে। প্রবাসীদের কাছে ঈদ মানেই দেশে ফেরার এক টুকরা স্বস্তি। কিন্তু বিমান টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের স্বপ্ন এখন অনেকের কাছেই অধরা হয়ে পড়েছে।

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের বড় একটি অংশ জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার বিমানভাড়া প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৫ সালে যেখানে প্যারিস-ঢাকা রিটার্ন টিকিট ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যেত, বর্তমানে একই টিকিটের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায়। কিছু ক্ষেত্রে ভাড়া আরও বেশি চাওয়া হচ্ছে।

প্রবাসীদের অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক জ¦ালানি বাজারের অস্থিরতা, অ্যাভিয়েশন ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঈদকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে। কিছু রুট সীমিত হওয়া, ফ্লাইট পুনর্বিন্যাস এবং অপারেশন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে বিমানভাড়া বেড়েছে।

প্যারিসে বসবাসরত অনেক প্রবাসী বলছেন, বছরের অধিকাংশ সময় পরিবার ছাড়া কাটালেও ঈদের সময়টুকু সবচেয়ে বড় আবেগ। কিন্তু এবার সেই ঈদও কাটবে প্রবাসে, মোবাইল ফোনের পর্দায় পরিবারকে দেখেই।

প্যারিসপ্রবাসী মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, ‘সারা বছর মেয়েটা শুধু জিজ্ঞেস করে, বাবা কবে আসবা? এবার টিকিটের দাম শুনে আর সাহস পাইনি। দুই লাখ টাকা দিয়ে দেশে গেলে পরিবারের জন্য কী নিয়ে যাব?’

আরেক প্রবাসী আমিন বলেন, শুধু বিমানভাড়া নয়, ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সঞ্চয় কমে গেছে। ফলে দেশে যাওয়া এখন অনেকের কাছেই বিলাসিতা।

চট্টগ্রামের বাসিন্দা ও ফ্রান্সপ্রবাসী ট্রাভেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এনাম জানান, ২০২৫ সালে বাংলাদেশগামী টিকিট ৮০০ ইউরোতে পাওয়া যেত, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার টাকা। বর্তমানে একই টিকিটের দাম ১ হাজার ৪০০ ইউরো ছাড়িয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৮৩ হাজার টাকা বেশি। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে কিছু এয়ারলাইনস তাদের নির্ধারিত রুটে সীমিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে কুয়েত এয়ারওয়েজ ও এমিরেটসের কিছু ফ্লাইট সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য এয়ারলাইনসের ওপর। ফলে সৌদি এয়ারলাইনসসহ চালু থাকা ফ্লাইটগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ তৈরি হয়েছে।

ফ্রান্সের আরেক ট্রাভেল ব্যবসায়ী মন্ডিয়াল ট্রাভেলের স্বত্বাধিকারী ইব্রাহিম হাসান বলেন, অনেকে টিকিট করতে এসে উচ্চমূল্য ও সময়মতো সিডিউল না পাওয়ার কারণে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ ঈদের ছুটি বাতিল করছেন, আবার কেউ সফরের পরিকল্পনাই বাদ দিচ্ছেন।

তিনি জানান, জুন, জুলাই ও আগস্ট সাধারণত ইউরোপে ভ্রমণের ব্যস্ত মৌসুম। কিন্তু এবার অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে যাত্রী কমে গেছে। ফলে ট্রাভেল ব্যবসায়ও ধস নেমেছে। সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন প্রবাসীরা। কেউ লিখছেন, ‘ঈদ আসছে, কিন্তু মন দেশে যেতে পারছে না।’ আবার কেউ বলছেন, ‘প্রবাসের সবচেয়ে কষ্টের ঈদ সেই ঈদ, যেদিন সন্তান বাবাকে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখে সালাম করে।’